রাকিব হাসান জিসান : আইনজীবী হওয়ার প্রাক্কালেই শিক্ষানবিশদের গুনতে হয় বিভিন্ন ফি, যেমন: ইন্টিমেশন জমা দেওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে ১০৮০ টাকা প্রদান করতে হয়, পরবর্তীতে রেজিস্ট্রেশন ও ফরম ফিলাপের জন্য দিতে হয় প্রায় ৫০০০ টাকা। পরবর্তীতে প্র্যাক্টিস করার অনুমতি প্রাপ্ত হলে আবার বার কাউন্সিলের বিভিন্ন ফি দিতে হয়। এসবের পরেও প্রত্যেকটি জেলা আইনজীবী সমিতিতে সদস্যভুক্তির জন্য দিতে হয় বিভিন্ন জেলা বারের নির্ধারণ করা অতিরঞ্জিত ফি! এই ফি নির্ধারণে নেই কোনো সীমানা; কোনো কোনো আইনজীবী সমিতি লক্ষাধিক টাকা নেয় সদস্যভুক্তির জন্য, যা সম্পূর্ণ লাগামহীন ও স্বেচ্ছাচারিতার নামান্তর বটে।
গত ১৫-০৩-২০২৬ ইং তারিখে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ একটি প্রজ্ঞাপনে নতুন আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তদের তালিকা প্রকাশ করেন এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের বিধি-আইনানুসারে প্রত্যেক অনুমতি প্রাপ্ত ব্যক্তিকে আইনপেশা চর্চার জন্য অবশ্যই নির্দিষ্ট আইনজীবী সমিতির সদস্যভুক্ত হতে হবে, যার সময়সীমা ফলাফল প্রকাশের পরবর্তী ০৬ মাস। সেইমতে বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জেলা আইনজীবী সমিতিতে সনদপ্রাপ্তদের তালিকা ধাপে ধাপে প্রেরণ করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতি তাদের গঠনতন্ত্র ও সমিতির নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে সদস্যভুক্তির ফি-এর তালিকা প্রকাশ করছেন।
আরও পড়ুন : চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিতে বর্ণিল বৈশাখী উৎসব উদযাপন
বাস্তবতায় দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতি বিভিন্ন রকমের চাঁদার হার নির্ধারণ করে থাকে। এই চাঁদার হার নির্ধারণে নেই কোনো আইনানুগ সীমারেখা ও বার কাউন্সিলের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। সম্প্রতি সিলেট জেলার আইনজীবী সমিতি তাদের নতুন আইনজীবী সদস্যভুক্তির জন্য সর্বোচ্চ ১,৩২,৫০০/- (এক লক্ষ বত্রিশ হাজার পাঁচশত টাকা) নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতি প্রায় ৬২,০০০/- (বাষট্টি হাজার) টাকা, নীলফামারী আইনজীবী সমিতিতে প্রায় ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা, ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে প্রায় ৩০,০০০/- (ত্রিশ হাজার) টাকা নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ, এই সদস্যভুক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট নির্ধারিত ফি নেই; প্রত্যেকটি জেলায় নিজস্ব কাঠামোতেই চলছে এমন অপ্রত্যাশিত ফি আদায়ের মহড়া।
একজন নবীন আইনজীবী শিক্ষানবিশ অবস্থায় গড়ে ২০০-৫০০ টাকা পেয়ে থাকেন দৈনিক হাতখরচ হিসেবে। সিনিয়র আইনজীবী ভালো হলে এতটুকু দিয়ে থাকেন, অন্যথায় ৫০-১০০ টাকার বেশি দেওয়ার নজির খুব কম। এই পরিমাণ টাকায় একজন সাধারণ মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার মেটানো প্রায় অসম্ভব। সেখানে সুটেড-বুটেড হয়ে ন্যূনতম মানবিক জীবনযাপন করা দুঃস্বপ্ন বটে।
এতটা স্ট্রাগলের পর চড়াই-উতরাই পার করে বার কাউন্সিলের তিন ধাপের কঠিন পরীক্ষার যাত্রা শেষ করে শিক্ষানবিশ থেকে নাম লেখাতে হয় বিজ্ঞ আইনজীবীর তালিকায়। প্রায় প্রথম শ্রেণীর চাকরির মতোই তিন ধাপের প্রিলি, রিটেন ও ভাইভা দিয়ে শিক্ষানবিশ নামক অভিশপ্ত বেকার জীবনের ইতি টেনে স্বপ্ন দেখে আইনাঙ্গণের মহীরুহ হওয়ার। কিন্তু সনদপ্রাপ্ত হলেও প্রত্যেকটি আইনজীবী সমিতির উচ্চহারে চাঁদা নির্ধারণের ফলে নবাগত বিজ্ঞ আইনজীবীদের জীবন হয়ে উঠছে দুর্বিষহ ও বিভীষিকাময়। বয়সের বেড়াজালে হয়তোবা আড়ালে-আবডালে ঢেকুরে কেঁদে চলছে নবীন আইনজীবীর প্রাণ।
আরও পড়ুন : বার কাউন্সিল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির
যেখানে শিক্ষানবিশ অবস্থায় তিন বেলা খেয়ে-পড়ে জীবন কাটাতেই কষ্ট হতো, সেখানে একজন নবাগত বিজ্ঞ আইনজীবী কিভাবে লক্ষ টাকা সদস্যভুক্তির জন্য প্রদান করবেন? লক্ষাধিক না হলেও ৩০-৬০ হাজার টাকা কিভাবে যোগাড় করবে সদ্য শিক্ষানবিশ জীবন শেষ করা ব্যক্তিটি? জেলা আইনজীবী সমিতিতে সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাঁদার হার নির্ধারণে নেই কোনো সুস্পষ্ট বর্ণনা ও আইন-বিধিমালা।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল জেলা আইনজীবী সমিতিগুলোর প্রতি বছর চাঁদা নির্ধারণে স্বেচ্ছাচারিতার নমুনা দেখার পরেও কেমন যেন অভিভাবকহীন মনোভাব পোষণ করে থাকে। প্রত্যেকটি ব্যাচ আইনজীবী হিসেবে সমিতিতে প্রবেশের সময় এই সদস্যভুক্তির অতিরঞ্জিত চাঁদা নির্ধারণের বিপক্ষে লেখালেখি ও আলোচনা উঠলেও বিজ্ঞ আইনজীবীদের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভূমিকা থাকে নিশ্চুপ। আইনজীবী নেতৃত্বের নেই কোনো ভ্রুক্ষেপ। কেমন যেন অভিভাবকহীন এক পেশার যাত্রায় সাগরে তলিয়ে যাওয়ার নামান্তর। অথচ আজকের নবাগত বিজ্ঞ আইনজীবীরাই একদিন দেশসেরা হয়ে উঠবে। কিন্তু এই আইন পেশার প্রাক্কালে সদস্যভুক্ত হওয়ার জন্য আর্থিক ও মানসিক চাপে থাকলে পেশাগত জীবন হয়ে উঠবে দুর্বিষহ; আইনি সেবা দিতে গিয়ে নীতি-নৈতিকতার খেই হারিয়ে ফেলা যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।
নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল মহোদয়ের সদয় উদ্যোগে জেলা আইনজীবী সমিতিগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা ও অযৌক্তিক চাঁদা নির্ধারণের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নীতিমালা ও বিধিমালা প্রণয়ন সময়ের দাবি। দেশের প্রত্যেকটি জেলা আইনজীবী সমিতি যেন একই হারে চাঁদা নির্ধারণের জন্য উৎসাহ পায় এবং একই ধরনের প্রক্রিয়ায় সদস্যভুক্ত হতে পারে, সেই লক্ষ্যে বার কাউন্সিলের বিশেষ ভূমিকা ও নির্দেশনা প্রয়োজন। অন্যথায় আর্থিক অভাব-অনটনের বেড়াজালে আইন পেশা থেকে নতুনরা মুখ ফিরিয়ে নেবে; আইনাঙ্গণে আসবে না ডায়নামিক ও নতুন প্রজন্মের মুখ।
এইসব বিষয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও অ্যাটর্নি জেনারেলের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ ও সমাধানের লক্ষ্যে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি এবং সময়ের দাবি।
লেখক: রাকিব হাসান জিসান; আইনজীবী, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, মুন্সীগঞ্জ।

