কোর্ট কাচারির টয়লেটনামা : ন্যায়ের প্রাঙ্গণে অপমানের গন্ধ
আবদুল্লাহ আল আশিক

আইনজীবী হতে জীবিত থাকা জরুরি, বয়স কোনো ব্যাপার না!

আবদুল্লাহ আল আশিক : এইতো কিছুদিন পূর্বে একটি সংবাদপত্রে একটা নিউজ দেখতে পেলাম। যেখানে দেখা গেল একজন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ আইনজীবী হওয়ার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছেন। তার স্ত্রী পরীক্ষার্থী স্বামীর জন্য আনন্দিত। তার এই অসীম সাহসিকতাকে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাই; তার সাথে সাথে এটিও বুঝতে পারলাম, সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন শুনবো একই পরিবারের দাদা, বাবা, ছেলে ও নাতি একইসাথে আইনজীবী হয়েছেন। বিষয়টি দিনদিন এমন হয়ে যাচ্ছে, একজন ব্যক্তির কোনো কিছু ভালো লাগছে না, তিনি ভাবলেন, ধুর আইনজীবী হই। অথবা তিনি এভাবেও ভাবতে পারেন, আইনজীবী হতে তো তিনটি পরীক্ষা দিতে হবে, ধ্যাততেরি, শিক্ষানবিশ আইনজীবী হই।

এই যে আইনজীবী হই কিংবা শিক্ষানবিশ আইনজীবী হই—এই সমস্যার মূলে রয়েছে আইনজীবী হওয়ার জন্য সর্বশেষ বয়স নির্ধারণ নেই। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রচলিত কোনো আইনে বলা নেই, এত বয়সের পর আপনি আর আইনজীবী হতে পারবেন না। তবে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল আইনের ২৭(১) অনুচ্ছেদে এটা বলা আছে, একজন প্রার্থীকে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য অন্তত ২১ বছর পূর্ণ হতে হবে। সুতরাং বিয়ের বয়স নির্ধারণ করা আছে, বাবা হওয়ার বয়স নির্ধারণ নেই। যার ফলে আইনজীবী পেশা অনেকটা হুমকির মুখে ধাবিত হচ্ছে। তাই এই পেশায় বটতলা, গারদখানা ও পুলিশ স্টেশন উকিলের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আরও পড়ুন : উকিলের পোশাকে বিচারক: নিজের স্বীকারোক্তিতেই ফাঁস হলো আইনের ফাঁক

একজন ফ্রেশার বা রেগুলার স্টুডেন্ট, যার স্বপ্ন থাকে আইনজীবী হওয়ার—যিনি প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেন একজন দক্ষ ও চৌকস আইনজীবী হতে—তার স্বপ্নগুলো অঙ্কুরে বিনষ্ট হচ্ছে আইনজীবী হওয়ার বয়সসীমা নির্ধারণ নেই বলে। অধিকাংশ পেশার মতো আইনজীবীও একটি সিনিয়র-নির্ভর পেশা। তবে আমাদের দেশের মানুষ যে প্রবাদটি বেশি অনুসরণ করে সেটি হচ্ছে, প্রথমে দর্শনধারী পরে গুণ বিচারী। তাই এখনো আমাদের দেশের মানুষ কালো চুল ও তরুণ ত্বকের যুবকের চেয়ে চুল-দাড়ি পেকে যাওয়া মানুষটার উপর বেশি নির্ভর করেন। অর্থাৎ বাস ড্রাইভার যদি তরুণ হয়, যাত্রীরা বলবে এই ছেলেটা নির্ঘাত মুখোমুখি সংঘর্ষ করবে; আর যদি ড্রাইভার বয়স্ক হন, তাহলে যাত্রীরা চোখ বন্ধ করে নাক ডেকে ঘুমাবে—হোক সেই বয়স্ক ড্রাইভার চোখে কম দেখেন।

এটাই আমাদের দেশের মানুষের সাইকোলজি। সেই সাইকোলজি থেকে আদালত প্রাঙ্গণে একজন ভুক্তভোগী এসে প্রথমেই জিজ্ঞেস করেন, সিনিয়র নেই? মানে, আপনি আইনজীবী হিসেবে ১২ বছর প্র্যাকটিস করে ফেলেছেন, অথচ আপনার চুল একটু কালো ও দাড়ি পাকে নি। সঙ্গে সঙ্গে ক্লায়েন্ট ধরে নেবেন, আপনি কিছুই জানেন না। হ্যাঁ, এটা অবশ্যই সত্য—আইন পেশা একটি সিনিয়র-নির্ভর পেশা। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে চেহারা-সুরতে আপনি সিনিয়র না হলে এই পেশায় প্রথমেই আপনি মার খেয়ে যাবেন। আর সেই সুযোগটাই নিয়ে নিচ্ছেন আইন না জানা বয়সভিত্তিক তথাকথিত সিনিয়র আইনজীবীরা। এতে করে প্রতিনিয়ত যেমন ভিত্তিহীন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ভুক্তভোগী মানুষ আদালতে এসে আরও বেশি ভুক্তভোগীর শিকার হচ্ছেন।

আরও পড়ুন : ফৌজদারী অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি পাসপোর্ট পাবেন কিনা: কী বলছে দেশের প্রচলিত পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন আইন

সকল আইনজীবীদের অভিভাবক হচ্ছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। সুতরাং এই মুহূর্তে বার কাউন্সিলের উচিত যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। অতীতের নিয়মে চললে এই সমস্যা আরও বেশি পুঞ্জীভূত হবে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এখনো পাস কোর্সগুলো চলছে, যা এই ধরনের সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। ল’ কলেজগুলোকে একটি সঠিক নিয়মে নিয়ে আসা জরুরি। যেকেউ যেকোনো সময় ওই কলেজে ভর্তি হয়ে দুই বছরের ল’ পড়ে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে নিজেকে দাবি করছে। তাছাড়া অনেক ল’ কলেজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারে—

√ রেগুলার স্টুডেন্ট ব্যতীত কেউ আইন সাবজেক্ট পড়তে পারবে না;
√ ৪০ বছরের ঊর্ধ্বে কেউ আইনজীবী সনদ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না;
√ একবার যে ব্যক্তি ক্লার্ক হিসেবে নিজের পরিচয়পত্র নিয়েছে, তিনি আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন না;
√ ল’ কলেজগুলো ২ বছরের পরিবর্তে ৪ বছরের কোর্সে স্টুডেন্ট ভর্তি নেবে এবং বছরে ৮০ জনের বেশি ভর্তি নিতে পারবে না;
√ অন্য পেশা বা সাবজেক্ট থেকে যিনি ল’ বিষয়ে পড়তে চান, তাকে অবশ্যই বার কাউন্সিল থেকে পারমিশন নিতে হবে;
√ দ্বৈত পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিকে সনদ সারেন্ডারের নির্দেশ দিতে হবে, অন্যথায় সাজার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে;
√ অনিয়মে অভিযুক্ত কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ক অধ্যয়ন বাতিল করা;

এছাড়া বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১৭ সালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বনাম এ.কে.এম. ফজরুল করিম মামলায় বার কাউন্সিলকে আইনজীবী সনদ প্রদানের জন্য একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ বয়স ৪০ বছর নির্ধারণের জন্য দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। আদৌ সে বিষয়ে কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ঠিক আছে, মানলাম—ভারত, পাকিস্তান কিংবা শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশেই বয়সসীমা নির্ধারণ নেই। তা-ই বলে আমরা কেন বয়সসীমা নির্ধারণ করে উদাহরণ হয়ে উঠবো না?

আরও পড়ুন : ঢাকার দুই সিটির জন্য দুই পুলিশ কমিশনার নিয়োগ করতে হাইকোর্টে রিট

পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমানে আইনজীবীর সংখ্যা ৮০ হাজার ছাড়িয়েছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে ১৮ কোটি মানুষের জন্য ৮০ হাজার আইনজীবী নগণ্য। তাই বলে দাদা-চাচাদের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তি করার মতো অসহায়ত্ব এখনো আসে নি। অসংখ্য তরুণ রয়েছে, যারা আইনজীবী হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। যাদের সামনে আছে অগণিত সময়, যারা নিজেদের ঘষামাজা করে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্তে দক্ষ আইনজীবী হয়ে উঠবেন। আইন জগতের এই মহাসমুদ্র সেসব তরুণদের দিকে তাকিয়ে। তাই আইনের মর্যাদা ও গৌরব ফিরিয়ে আনতে এখনই সময় আইনজীবী হওয়ার বয়সসীমা নির্ধারণ করে একই পরিবারের দাদা-বাবা-ছেলে ও নাতিকে একইসাথে আইনজীবী হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ থেকে বিতাড়িত করার। তা না হলে, ওই পরিবারের জন্য বিষয়টি যতটা সৌভাগ্যের, তার চেয়ে অনেক বেশি আইন পেশা ও ন্যায়বিচারপ্রার্থীদের জন্য দুর্ভাগ্যের।

লেখক: আবদুল্লাহ আল আশিক; অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।