মোকাররামুছ সাকলান
মোকাররামুছ সাকলান

উকিলের পোশাকে বিচারক: নিজের স্বীকারোক্তিতেই ফাঁস হলো আইনের ফাঁক

মোকাররামুছ সাকলান : আদালতের এজলাসে দাঁড়িয়ে একজন আইনজীবী যখন বলেন, “মি. লর্ড, আমি অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ”, তখন বেঞ্চের প্রতি তার এক ধরনের অদৃশ্য সহজাত দুর্বলতা কাজ করে। এই দুর্বলতা যে কোনো সুস্থ বিচার ব্যবস্থার জন্য বিষফোঁড়া। ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ৬৫এ(২) বিধিতে পরিষ্কার ভাষায় লেখা আছে—অবসরপ্রাপ্ত বিচারকরা আইনজীবী হিসেবে শুধু হাইকোর্ট বিভাগে মামলা লড়তে পারবেন, অধস্তন কোনো আদালতে বা ট্রাইব্যুনালে নন।

কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের আইনজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ মো. মাসদার হোসেন কি আদৌ এই বিধান মানেননি? উত্তরটা আমরা পেলাম তার নিজের মুখ থেকেই।

সম্প্রতি একটি ভ্যাট-সংক্রান্ত মামলায় গণমাধ্যমে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মাসদার হোসেন সাহেব ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলন করেন। নিজের পেশাদার সততা প্রমাণ করতে গিয়ে তিনি যে লিখিত বক্তব্য পড়েছেন, তা একজন আইনজীবী হিসেবে তার বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বড় দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখানে তিনি আইনের দেয়াল ভেদ করতে পারবেন কি না সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানে আইনের ‘ভুল বোঝাবুঝির’ কোনো অবকাশ নেই।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বিধিমালা, ১৯৭২-এর ৬৫এ(২) বিধি। আইনের এই অনুচ্ছেদটির ভাষা এতটাই স্পষ্ট যে, এর ব্যাখ্যায় কোনো ফাঁকফোকর নেই। প্রাক্তন বিচারকদের বিষয়ে বিধিটির শেষ প্রান্তে যে শর্তটি দেওয়া আছে, তা নিম্নরূপ:

Provided that such Advocates (former judicial officer) shall not be eligible for appearing and/or accepting any brief or maintaining any practice before any subordinate court. They will be permitted to practice only before the High Court Division of the Supreme Court of Bangladesh.

বাংলা অর্থ: “তবে শর্ত থাকে যে, এইরূপ আইনজীবীগণ (প্রাক্তন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা) কোনো অধস্তন আদালতে কোনো মামলা উপস্থাপন এবং/অথবা গ্রহণ করতে বা কোনো প্রকার আইন চর্চা রক্ষা করতে সমর্থ হবেন না। তাঁরা শুধুমাত্র বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সামনে আইন চর্চার অনুমতি পাবেন।”

আরও পড়ুন : রিট পিটিশনের ফাইল ‘গায়েব’ অভিযোগে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের কর্মচারী আটক

এই বাক্যটির মধ্যে “only” (শুধুমাত্র) শব্দটি সর্বাধিক গুরুত্ববহ। এই একটি শব্দই স্পষ্ট করে দেয় যে, হাইকোর্ট বিভাগ ব্যতীত বাংলাদেশের অন্য কোনো ফোরাম—তা অধস্তন দেওয়ানি আদালত হোক, ফৌজদারি আদালত হোক, কিংবা বিশেষায়িত রাজস্ব ট্রাইব্যুনাল হোক—সেখানে সাবেক বিচারকের প্রবেশাধিকার আইনত নিষিদ্ধ। “Only” শব্দটি একটি exclusive exclusionary বৃত্ত তৈরি করে, যার বাইরে গেলেই বিধি লঙ্ঘিত হয়।

তাহলে ট্রাইব্যুনাল কি আদালত নয়? পার্থক্যটা কোথায়? মাসদার হোসেন সাহেব নিজেই বলেছেন, “নূর প্লাস্টিকস ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির মামলায় কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল দায়ের করি।” শুধু তাই নয়, ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রিমান্ডে পাঠানোর পর পুনরায় বিবেচনার সময় তিনি আবারও আপিল দায়ের করেন এবং সুদ মওকুফের আদেশ আনেন।

এখন প্রশ্ন হলো, কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর অধীনে গঠিত এই ট্রাইব্যুনালটি কি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অংশ? উত্তর একবাক্যে—না। এটি একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। এর বিরুদ্ধে আপিল হয় হাইকোর্টে। একজন সাবেক জেলা জজ, যিনি আইনজীবী হয়েছেন, তার জন্য এই ট্রাইব্যুনাল ঠিক ততটাই ‘নিষিদ্ধ’, যতটা নিষিদ্ধ কোনো সহকারী জজের আদালত।

অনেকে হয়তো তর্ক করবেন, ট্রাইব্যুনাল তো ‘অধস্তন আদালত’ (subordinate court) নয়, এটি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু এই তর্কের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। প্রথমত, বার কাউন্সিলের বিধিতে বলা আছে ‘শুধুমাত্র হাইকোর্ট বিভাগে’; এখানে আদালত বা ট্রাইব্যুনালের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, কাস্টমস আইনের ২২৫ ধারার গঠনই বলে দেয় এই ট্রাইব্যুনাল বিচারিক আদালতের সমতুল্য।

আইনটি পরিষ্কার বলছে, এই ট্রাইব্যুনালের সদস্য হতে পারেন একজন ‘অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পদে কর্মরত’ ব্যক্তি। অর্থাৎ, যে পদে বসে একজন বিচারক অধস্তন আদালতে রায় দেন, ঠিক সেই পদের একজন কর্মরত বিচারকই এখানে সদস্য হিসেবে বসেন। তাহলে এই ট্রাইব্যুনালকে ‘অধস্তন আদালত’ থেকে আলাদা করার সুযোগ কোথায়? আইন নিজেই স্বীকার করছে যে ট্রাইব্যুনাল এবং অধস্তন আদালত একই বিচারিক স্তরের অংশ।

আরও পড়ুন : হাইকোর্টে ৬৩টি বেঞ্চ গঠন, ১৯ এপ্রিল থেকে বিচারকার্য শুরু

এর আগে আপিল বিভাগ যা রায় দিয়েছে, তা একবার দেখে আসি। আসলে বিষয়টি শুধু আইনের ব্যাখ্যা নয়, এটি সর্বোচ্চ আদালতের রায় দ্বারা নিষ্পত্তিকৃত। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১৪ সালের এক যুগান্তকারী রায়ে (সিভিল আপিল নং ২৩৫) সরাসরি ৬৫এ(২) বিধির বৈধতা ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ বলেছিলেন:

Rule 65A(ii) of the Bangladesh Bar Council Rules, 1972 … does not violate article 40 of the constitution. … The Bar Council having realized that if a judicial officer after performing judicial functions for a period at least for ten years is allowed to practice in the lower courts, the spirit of public service and the task of upholding rule of law may be hampered … accordingly it restricted them to practice in the lower courts by way of amendment to the Rules.

(বাংলা সারাংশ: একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা দশ বছর বিচারিক দায়িত্ব পালনের পর নিম্ন আদালতে আইন চর্চা করলে জনসেবার চেতনা ও আইনের শাসন ক্ষুণ্ণ হয়। তাই নিম্ন আদালতে অনুশীলনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।)

আদালত আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে যুক্তি হলো—যেসব বিচারক পূর্বে তার অধীনে কাজ করেছেন বা তার সহকর্মী ছিলেন, তাদের আদালতে গিয়ে সওয়াল করা ‘অনৈতিক, অমর্যাদাকর ও বিব্রতকর’। এই রায়েই আপিল বিভাগ ৬৫এ(২) বিধিকে সংবিধানসম্মত ও যুক্তিসঙ্গত বলে চূড়ান্ত সায় দিয়েছেন।

আরও পড়ুন : ফৌজদারী অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি পাসপোর্ট পাবেন কিনা: কী বলছে দেশের প্রচলিত পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন আইন

তাহলে কি মাসদার সাহেব নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলেন? আইনের মজার বিষয় হলো, এখানে তথ্যগত কোনো বিতর্ক নেই। এটা কোনো সাংবাদিকের তদন্ত প্রতিবেদন নয়, যেখানে ভুল তথ্যের সম্ভাবনা থাকে। এটা স্বয়ং আইনজীবীর স্বাক্ষরিত বিবৃতি—আইনের ভাষায় যাকে বলে ‘এডমিশন’ বা স্বীকারোক্তি। এই স্বীকারোক্তি বার কাউন্সিলের ডিসিপ্লিনারি কমিটির কাছে পেশ করা হলে তা অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে।

মাসদার হোসেন সাহেব নিজেও এই পার্থক্য বোঝেন। তার বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেছেন, “এরপরও আইনি স্বার্থে আমি মহামান্য হাইকোর্টে ভ্যাট আপিল দায়ের করি।” অর্থাৎ, হাইকোর্ট কোনটি আর ট্রাইব্যুনাল কোনটি—সে পার্থক্য তার অজানা নয়। তবু তিনি ট্রাইব্যুনালে সওয়াল করেছেন।

পরিশেষে বলতে চাই, বিচারকের আসন থেকে অবসরের পর আইনজীবী হওয়াটা দোষের কিছু নয়; বরং অভিজ্ঞতা দিয়ে আইন পেশাকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ। কিন্তু যখন সেই অভিজ্ঞতাকে হাতিয়ার করে নিম্ন আদালতের (বা সমতুল্য ট্রাইব্যুনালের) কাঠামোয় আইন চর্চার নামে প্রভাব বিস্তার করা হয়, তখন সেটা আইনের চোখে অপরাধ।

মাসদার হোসেন সাহেব নিজের দেওয়া প্রেস ব্রিফিংয়ে হয়তো ভেবেছিলেন তিনি সাংবাদিকদের জবাব দিচ্ছেন। কিন্তু অনিচ্ছাকৃতভাবে তিনি আইন অমান্য করার একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বার কাউন্সিলের টেবিলে তুলে দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়—আইনের চোখে ‘প্রাক্তন বিচারক’ পরিচয়টা ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, নাকি দায়িত্বটা আরও কঠোর হয়।

লেখক : মোকাররামুছ সাকলান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।