সিরাজ প্রামাণিক : আইন পেশা কেবল একটি জীবিকা নয়, এটি একটি মহান সেবা। কিন্তু কোনো আইনজীবী যদি পেশাগত নীতিমালার বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করেন, তবে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল তার সনদ স্থগিত বা বাতিল করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে।
মক্কেলের সোয়া কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আলোচিত সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মাসদার হোসেনের ‘আইনজীবী সনদ’ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। এর আগ পর্যন্ত বিচার বিভাগ পৃথককরণ মামলার বাদী হিসেবে সুপরিচিত মাসদার হোসেন আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করেন উচ্চ আদালতে। সেই সুবাদে এক মক্কেলের কাছ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। বিনিময়ে তিনি তার মক্কেলের কোনো কাজ করেননি। ফলে ভুক্তভোগী ওই বিচারপ্রার্থীকে আরও ৪২ লাখ টাকার বেশি খেসারত গুনতে হয়েছে।
উল্লেখ্য, মাসদার হোসেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন। ১৯৯৫ সালে তিনি বিসিএস জুডিশিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ছিলেন। তখন নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথককরণ সংক্রান্ত মামলাটি তিনি ও তার সহকর্মী বিচারকেরা দায়ের করেছিলেন, যেটি ‘মাসদার হোসেন মামলা’ নামে পরিচিতি পায়।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল হলো দেশের সব আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। ১৯৭২ সালে এটি গঠিত।
এ সংস্থাটি আইনজীবীদের সনদ দেয়, পেশাগত নৈতিকতা নির্ধারণ করে, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে শাস্তি দেয়। অর্থাৎ, আইনজীবীদের লাইসেন্স দেওয়া ও বাতিল করার একমাত্র কর্তৃপক্ষ এটিই। সনদ ছাড়া কেউ আইন পেশা চালাতে পারেন না।
বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর আর্টিকেল ৩২ স্পষ্ট বলেছে, “যদি কোনো আইনজীবী পেশাগত অসদাচরণ বা অন্য কোনো অসদাচরণে দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে বার কাউন্সিল তাকে তিরস্কার, সাময়িক স্থগিত বা স্থায়ী বাতিল করতে পারে।”
আরও পড়ুন : উকিলের পোশাকে বিচারক: নিজের স্বীকারোক্তিতেই ফাঁস হলো আইনের ফাঁক
যেকোনো আদালত বা সাধারণ মানুষ একজন আইনজীবীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করতে পারেন। বার কাউন্সিল প্রাথমিক তদন্ত করে। প্রাথমিক সত্যতা পেলে সাময়িক স্থগিত করে এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। ট্রাইব্যুনাল ৩ সদস্যের তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেয়। তদন্ত চলাকালে ওই আইনজীবী সাময়িক স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের জন্য বার কাউন্সিলে আবেদন করতে পারবেন। বার কাউন্সিল আবেদন না রাখলে এবং সনদ স্থগিতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখলে তিনি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন। ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
যে কাজসমূহ একজন আইনজীবীর পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে, তার মধ্যে অন্যতম—
১। মক্কেলের টাকা আত্মসাৎ, অর্থাৎ মামলার টাকা নিয়ে ফেরত না দেওয়া বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা ইত্যাদি
২। জাল-মিথ্যা তথ্য দিয়ে সনদ নেওয়া, যেমন চাকরিচ্যুতির তথ্য লুকানো, জাল সার্টিফিকেট দাখিল করা ইত্যাদি
৩। ঘুষ বা দুর্নীতি, অর্থাৎ বিচারককে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা ইত্যাদি
৪। আদালতের প্রতি অসম্মান বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া ইত্যাদি
৫। মক্কেলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, অর্থাৎ মামলার গোপন তথ্য ফাঁস করা, স্বার্থের সংঘাত লুকানো ইত্যাদি
৬। ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়া, অর্থাৎ মানসম্মানহানিকর অপরাধ ইত্যাদি
৭। পেশাগত দায়িত্ব পালনে গুরুতর অবহেলা ইত্যাদি
উপরোক্ত কারণসমূহের যেকোনো একটি প্রমাণিত হলে সনদ সাময়িক স্থগিত নয়, অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী বাতিলও হতে পারে।
কারণ, আইনজীবী হলেন ন্যায়বিচারের অংশীদার। তাঁদের অসদাচরণে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়, আদালতের বিশ্বাস নষ্ট হয়। বার কাউন্সিলের এই ক্ষমতা আছে বলেই পেশাটা স্বচ্ছ ও বিশ্বস্ত থাকে।
“সঠিক আইনজীবী বেছে নিন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুন। অসদাচরণ দেখলে চুপ করে থাকবেন না!”
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। ই-মেইল: seraj.pramanik@gmail.com

