শাহাদাত সুফল : সংবিধান একটি জাতির আলোকবর্তিকা, জাতিকে অন্ধকারে পথ দেখায়, যদি তারা তা খুঁজে নিতে পারে। মনে রাখতে হবে, আইন প্রণীত হয় মানুষের জন্য; মানুষ কীভাবে সে আইনের প্রতি মান্যতা দেখাবে, তা আইন ঠিক করে দেয়, কিন্তু আইন কারো কর্মে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না; তবে আইনের দৃষ্টিতে কারো কর্মকাণ্ড যদি শাস্তিযোগ্য হয়ে থাকে, তাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে পারে।
আমরা প্রায়শই হরেদরে সংবিধান কিংবা অন্য যেকোনো সাধারণ আইনকেও মন্দ হিসেবে আখ্যায়িত করি, কিন্তু আমরা ভুলে যাই—আইন আসলে তেমন নয়, যারা ব্যবহার করেন, তারাই তেমন করে ব্যবহার করেন; এটি আইনের দোষ নয়, বরং যে বা যারা ব্যবহার করেন (অন্যায় কাজে), দোষ তার বা তাদের।
সংবিধান হলো জীবন্ত-বৃক্ষ স্বরূপ; একটি জীবন্ত গাছ যেমন করে বিভিন্ন ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে থাকে, একইসাথে তার মাঝে কখনো কখনো কাঁটাও থাকে; আমরা ফুলের সুগন্ধ নিই, ফল ভক্ষণ করি; কিন্তু কাঁটা কিংবা বাড়তি ডালপালা ছেঁটে ফেলি। পরজীবী লতাপাতাও কখনো সখনো জড়িয়ে ফেলে, তাতে করে বৃক্ষ “হীন কিংবা ছোট” হয়ে যায় না; বরং, বৃক্ষ অন্য আরো ছোট ছোট পরজীবীর জন্য নিবিড় মমত্ববোধ নিয়ে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সংবিধানও তেমন; কখনো কেউ যদি ক্ষমতার যাতাঁকলে ফেলে জন-আকাঙ্ক্ষার বাইরে কোনো বিধান যুক্ত করেন, তার জন্য সংবিধান নিজে দায়ী নয়, বরং যারা ক্ষমতা উপভোগ করবার জন্য যুক্ত করেন, তারাই দায়ী হন।
আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় যে পরম মমতায় লেখা হয়েছিল— “উই, দ্য পিপল অব বাংলাদেশ”; অর্থাৎ, “আমরা, বাংলাদেশের জনগণ”। এই “আমরা”-এর যে দর্শন, তা কখনো বিভেদ ডেকে আনতে পারে না; তা সবসময় আমাদের দরদি কণ্ঠে নির্দেশ দেয়— এই “আমরা” মানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বাঙালি, অ-বাঙালি, আদিবাসী, পাহাড়ি, সমতলীয় ইত্যাদি প্রত্যেকে মিলে— “আমরা, বাংলাদেশের জনগণ”। বাংলাদেশের জনগণ হিসেবে আমরা এক ও অভিন্ন; আমাদের এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ভূখণ্ড যেমন করে রক্ষা করবার দায় আমাদের আছে, আমাদের সংবিধানকে রক্ষা করবারও পরম ও পবিত্র দায় ও দায়িত্ব (sacred duty) আমাদের আছে, এবং তা সংবিধানই আমাদের দিয়েছে।
আমরা যদি সংবিধানের প্রস্তাবনার চতুর্থ প্যারার দিকে তাকাই, আমরা দেখব—
আমরা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করিতেছি যে, আমরা যাহাতে স্বাধীন সত্তায় সমৃদ্ধি লাভ করিতে পারি এবং মানবজাতির প্রগতিশীল আশা-আকাঙ্ক্ষার সহিত সঙ্গতি রক্ষা করিয়া আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন করিতে পারি, সেইজন্য বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিস্বরূপ এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখা এবং ইহার রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান আমাদের পবিত্র কর্তব্য;
সুতরাং, রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন— “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি তুমি এই অপরূপ রূপের বাহির হলে জননী ওগো মা তোমায় দেখে-দেখে আঁখি না ফিরে তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে”
এই মা মানে— দেশ, দেশের মাটি; তার সাথে আমি যুক্ত করি— দেশের সংবিধান। এই সংবিধানকে আঁকড়ে ধরতে পারলেই আমরা অন্ধকারে আলোর দিশা পেতে পারি যা জাতি গঠনে কাজে আসতে পারে। আমি যে কারণে এই কথা বলছি— তার জন্য আবারও সংবিধানের কাছেই ফিরে যাই।
প্রস্তাবনার তৃতীয় প্যারায় লেখা আছে—
আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা— যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে;
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো— স্বাধীনতার পঞ্চাশোর্ধ্ব বছর পার হলেও কেন আমরা তা অর্জনে সক্ষম হলাম না? কেন আমরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি? কেন আমরা সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি? কেন আমরা মৌলিক মানবাধিকার (মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করার ফলে যাপিত জীবনে যা যা অধিকার ভোগ করা প্রয়োজন) নিশ্চিত করতে পারলাম না? কেন রাজনৈতিক সাম্য, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সুবিচার নিশ্চিত হলো না? কেন অর্থনৈতিক সাম্য, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সুবিচার নিশ্চিত হলো না? কেন সামাজিক সাম্য, সামাজিক স্বাধীনতা, সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হলো না? কেন?
কারণ, আমরা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি; এই তৈরি মানে শুধু তৈরি করা না, এই তৈরি মানে— রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। আমরা তা পারিনি। আমরা রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে (সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত) রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ রেখেছি। হেন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, হেন কোনো পেশা নেই, যেখানে আমরা রাজনীতি ইনপুট করিনি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন-আদালত, সাংবাদিকতাসহ সমস্ত ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ছত্রছায়া বিরাজ রেখেছি। এই করে তো রাষ্ট্র রাষ্ট্রের মতো করে দাঁড়ায় না। মর্যাদাশীল রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরির বিকল্প নেই।
আমরা বরং রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতিতে না এনে তাদের স্বকীয় করে তুললেই সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্র মর্যাদাশীল হবে। কিছু হলেই সংবিধানের দিকে আঙুল না তুলে আমরা বরং সেদিকে নজর রাখলেই জাতির মঙ্গল।
লেখক : শিক্ষানবিশ আইনজীবী; জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা।

