আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলায় রিপন দাসের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ

অ্যাডভোকেট আলিফ হত্যা মামলা: চিন্ময় দাসের ৬ষ্ঠ সময়ের আবেদন নামঞ্জুর, বাদীর সাক্ষ্য সমাপ্ত

আদালত প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম | চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন, দেশ-বিদেশে বহুল আলোচিত অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যাকাণ্ড মামলায় প্রধান অভিযুক্ত চন্দন কুমার ধর ওরফে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর পক্ষে ষষ্ঠবারের মতো করা সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। একই সাথে আদালত মামলার বাদী ও প্রথম সাক্ষী (PW-1)—নিহত আইনজীবী আলিফের বার্ধক্যজনিত সমস্যায় আক্রান্ত বৃদ্ধ পিতার সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করে পরবর্তী সাক্ষীর প্রতি সমন জারির নির্দেশ দিয়েছেন।

আজ বুধবার (২০ মে) চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটির গুরুত্বপূর্ণ জেরা ও শুনানির দিন ধার্য ছিল। শুনানিতে নিয়োজিত আইনজীবীর অনুপস্থিতি ও একের পর এক সময় আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই কঠোর ও আইনি আদেশ প্রদান করেন। মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২৪ জুন ২০২৬ খ্রি.

আজকের শুনানিতে আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবী অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য্য “উপস্থিত সাক্ষীকে জেরা করার জন্য সময়ের আবেদন” শীর্ষক একটি দরখাস্ত আদালতে দাখিল করেন। দরখাস্তে দাবি করা হয়, আসামিপক্ষের প্রধান নিয়োজিত আইনজীবী শারীরিক অসুস্থতার কারণে আজ আদালতে উপস্থিত হতে পারেননি, তাই সাক্ষীকে জেরার জন্য সময় প্রয়োজন।

তবে আদালতে দরখাস্তটি জমা দেওয়া হলেও শুনানির সময় নিয়োজিত বা অন্য কোনো আইনজীবী এজলাসে উপস্থিত ছিলেন না। এই বিষয়ে তীব্র আপত্তি তুলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিশেষ প্রসিকিউটর এস ইউ নুরুল ইসলাম আদালতে বলেন, “নিয়োজিত আইনজীবী নিজে উপস্থিত না থেকে, স্রেফ একটি স্বাক্ষরিত দরখাস্ত পাঠিয়ে অসুস্থতার অজুহাতে বারবার সময় চাইতে পারেন না। এটি বাংলাদেশের প্রচলিত আদালত প্র্যাকটিস (Court Practice) ও আইনি রীতির পরিপন্থী।”

উভয়পক্ষের যুক্তি ও প্র্যাকটিস বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল আসামিপক্ষের সময়ের আবেদনটি কোনো প্রকার শুনানি ছাড়াই সরাসরি নামঞ্জুর করেন।

৬ বার সময় আবেদন ও বৃদ্ধ পিতার হতাশা

আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির সুনির্দিষ্ট ধারায় চার্জ (অভিযোগ গঠন) করা হয়। এরপর গত ২ ফেব্রুয়ারি নিহত তরুণ আইনজীবী আলিফের পিতা প্রথম সাক্ষী (PW-1) হিসেবে আদালতে তাঁর চোখের সামনে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জবানবন্দি বা সাক্ষ্য প্রদান করেন। কিন্তু এরপর থেকে আসামিপক্ষ ধারাবাহিকভাবে জেরা কার্যক্রম সম্পন্ন না করে একে একে মোট ছয়বার সময়ের আবেদন দাখিল করে মামলাটি ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এবং আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (APP) অ্যাডভোকেট মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন:

নিহত অ্যাডভোকেট আলিফের পিতা প্রায় ৮০ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ। তিনি বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগ ও অসুস্থতা নিয়ে প্রতিটি ধার্য তারিখে লোহাগাড়া থেকে অত্যন্ত কষ্ট করে চট্টগ্রাম শহরের আদালতে উপস্থিত হচ্ছেন। কিন্তু আসামিপক্ষ বারবার সময় নেওয়ায় তিনি চরম মানসিক হতাশা ও বিচার পাওয়া নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছিলেন। আজ আমরা আদালতে জোরালো আইনি বক্তব্য তুলে ধরেছি। বিজ্ঞ আদালত সার্বিক দিক বিবেচনা করে PW-1 এর সাক্ষ্য সমাপ্ত ঘোষণা করেছেন।

তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দেশের আইনি অঙ্গনকে নাড়িয়ে দেওয়া এই স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডের বিচারটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যেই সুসম্পন্ন হবে।

ভার্চুয়ালি যুক্ত চিন্ময় দাস, নামঞ্জুর অন্য ৩ আবেদন

আজকের শুনানির সময় নিরাপত্তার স্বার্থে কারাগারে থাকা প্রধান অভিযুক্ত চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে ভার্চুয়ালি (কারাগার থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে) আদালতের সাথে যুক্ত করা হয়। এছাড়া জামিনে থাকা ও কারাগারে থাকা অন্যান্য আসামিদের ট্রাইব্যুনালে সশরীরে হাজির করা হয়।

ভার্চুয়াল শুনানিকালে চিন্ময় দাস বিজ্ঞ আদালতের অনুমতি নিয়ে তাঁর বৃদ্ধা মা এবং তাঁর আশ্রমের দুই সন্ন্যাসীর সঙ্গে কারাগারে সাক্ষাতের একটি মৌখিক আবেদন জানান। পাশাপাশি তাঁর পক্ষে জামিন, উন্নত চিকিৎসা এবং মামলার সময় চেয়ে আরও তিনটি পৃথক লিখিত আবেদন দাখিল করা হয়েছিল। তবে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে তাঁর পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত না থাকায় আদালত আইনি বিধি মোতাবেক সেগুলোও শুনানি ছাড়াই নামঞ্জুর করে দেন।