কোর্ট রিপোর্টার, সুনামগঞ্জ | আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিচারের নামে উগ্র ‘মব’ (Mob) বা উন্মত্ত জনতা সৃষ্টি করে ঘরবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন আদালত। সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় মাদক বিক্রির অভিযোগে এক যুবকের বসতবাড়িতে ‘মব’ সৃষ্টি করে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার ভিডিও দেখে স্বপ্রণোদিত (Suo Moto) হয়ে মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
গতকাল সোমবার (২২ জুন) বিকালে সুনামগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. এমদাদ স্বপ্রণোদিত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও পর্যালোচনা করে এই আদেশ দেন। তিনি বিশ্বম্ভরপুর থানা পুলিশকে ভিডিও দেখে ‘মব’ সৃষ্টিকারী উগ্র জনতাকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে নিয়মিত মামলা করার নির্দেশ প্রদান করেন।
আদালতের আদেশের সত্যতা নিশ্চিত করে বিশ্বম্ভরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহিন মিয়া বলেন, “আদালতের নির্দেশনা আমরা পেয়েছি। বিজ্ঞ আদালতের আদেশ পাওয়ার পর আমরা এরই মধ্যে থানায় নিয়মিত মামলা রুজু করেছি। ভিডিও ফুটেজ দেখে অপরাধে জড়িত দায়ীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের কাজ শুরু হয়েছে।”
ঘটনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ উল্লাস
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বিবরণ অনুযায়ী, গত রবিবার (২১ জুন) বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পাখিজান গ্রামে মাদক বিক্রির অভিযোগ তুলে আবু সাইদ নামের এক যুবকের ঘরবাড়িতে চড়াও হয় স্থানীয় কিছু জনতা। একপর্যায়ে উন্মত্ত জনতা তার ঘরে ব্যাপক হামলা-ভাঙচুর চালানোর পর অগ্নিসংযোগ করে সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেয়। এ সময় অভিযুক্ত যুবককে ঘর থেকে বের করে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। বর্বরোচিত ও বেআইনি এই ঘটনাটি উগ্র জনতা নিজেদের বীরত্ব জাহির করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘লাইভ’ সম্প্রচারের মাধ্যমে প্রচার ও উল্লাস করে।
বিষয়টি আদালত ও বিচারকের দৃষ্টিগোচর হওয়ায় তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ৩০৮৮ নম্বর দাপ্তরিক স্মারকের মাধ্যমে বিশ্বম্ভরপুর থানার ওসিকে অবিলম্বে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের এই লিখিত নির্দেশ দেন।
‘মব জাস্টিস’ সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন: বিচারকের পর্যবেক্ষণ
আদালত থেকে বিশ্বম্ভরপুর থানায় পাঠানো অফিশিয়াল নির্দেশনায় ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বিচারক মো. এমদাদ। নির্দেশনায় বলা হয়:
‘রবিবার বিভিন্ন অনলাইনসহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, উপজেলার পাখিজান গ্রামের আবু সাইদের বাড়িকে “মাদক বিক্রেতার বাড়ি” প্রচার চালিয়ে উন্মত্ত জনতা “মব” সৃষ্টি করে। পরে ওই বাড়িতে আগুন দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মারধরও করে উল্লাস করে জনতা। স্থানীয় জনতা বিচারের নামে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে; যা আইনের পরিপন্থি এবং বাংলাদেশের সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’
বিচারক তাঁর আদেশে সুনির্দিষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের (তিনি অপরাধী হলেও) স্বাধীন বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তি কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে তাকে আটক করে আইনের হাতে সোপর্দ করা এবং সুনির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনা রাষ্ট্র ও পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্ব; কোনো জনতার নয়।”
মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ও ভবিষ্যতের বিশৃঙ্খলা রোধের তাগিদ
আদালতের আদেশে আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, এ ধরনের ‘মব’ বা গণপিটুনি সৃষ্টি করে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া অত্যন্ত গুরুতর ও আমলযোগ্য অপরাধ; যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রের জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য এক বিরাট হুমকিস্বরূপ। এ ধরনের অরাজক ঘটনায় সরকার, বিচার বিভাগ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। মাঠপর্যায়ে এখনই যদি এর বিরুদ্ধে কঠোর ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে দেশে মারাত্মক প্রশাসনিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।
এই কারণে, পুলিশ প্রশাসনকে কোনো ধরনের বিলম্ব না করে উক্ত ঘটনার ভিডিও ও লাইভ ফুটেজ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে মব সৃষ্টিকারী ও অগ্নিসংযোগে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বলা হয়েছে। একই সাথে পুলিশকে নিজেই ‘এজাহারকারী’ (বাদী) হয়ে প্রচলিত আইনের কঠোর ধারার আওতায় মামলা রুজু করে জড়িতদের দ্রুত আইনের মুখোমুখি করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
আইনজীবীরা আদালতের এই স্বপ্রণোদিত আদেশকে সাধুবাদ জানিয়ে বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ‘মব জাস্টিস’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সুনামগঞ্জের আদালতের এই কঠোর অবস্থান তা প্রতিরোধে সারা দেশে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

