আবদুল্লাহ আল মামুন :একটি অপরাধের পেছনে সব সময় কোনো না কোনো কারণ থাকে, যা মামলার তদন্তে, সাক্ষ্য-প্রমাণে উঠে আসে। অপরাধ কারণবিহীন হলে সেটি যেমন প্রকোপন পরিস্থিতি তৈরি করে, ঠিক তেমনি অপরাধের কারণও একই পরিস্থিতি তৈরি করে। অপরাধ অনেক সময় একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে করা হয়। যেমন—খুন, শারীরিক আঘাত, ধর্ষণ প্রভৃতি। আবার, অপরাধ করা হয়ে থাকতে পারে সম্পত্তির বিরুদ্ধে। যেমন—চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই, প্রতারণা প্রভৃতি।
প্রায় সকল অপরাধের পেছনে লাভ-ক্ষতি কিংবা পৈশাচিক আনন্দ বা বিকৃতকাম যুক্ত থাকে। অনলাইনে কাউকে পঠন-অযোগ্য ভাষায় গালাগালি করে কিংবা বিকৃত ছবি তৈরি করে ছেড়ে দিয়ে কিংবা ধর্ষণের বা শারীরিক সম্পর্কের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করে অনবরত টাকা আদায় বা ধর্ষণ অপরাধীর অপরাধমনস্কতা প্রকাশ করে। এগুলোর সাথে যেমন আর্থিক লাভ থাকতে পারে, তেমনি অপরাধীর বিকৃত আনন্দও থাকতে পারে।
দণ্ড নির্ধারণের ক্ষেত্রে অপরাধের প্রকৃতি বা কারণ তাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপরাধীর উদ্দেশ্য অপরাধকে ব্যপ্তি দেয় এবং উপযুক্ত শাস্তি বা দণ্ড কী হতে পারে তা নির্ধারণ করতে আদালতকে সহযোগিতা করে।
যেমন—অভিযুক্ত রহিম দা দিয়ে কালামকে মাথায় আঘাত করলেন। এ অপরাধটি কালামের শরীরের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। আবার, রহিম যদি কালামের সেগুন বাগানে ঢুকে ৩০,০০,০০০/- টাকার সেগুন গাছ কেটে নিয়ে বিক্রি করে দেন, তবে অপরাধটি কালামের সম্পত্তির বিরুদ্ধে করা হয়েছে।
আবার, রহিম যদি কালামের নাবালিকা কন্যার সাথে প্রেমের সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং উক্ত সম্পর্কের ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে ছেড়ে দেন—এ অপরাধটি কালামের নাবালিকা সন্তানের শরীর ও উভয়ের সুনামের বিরুদ্ধে করা হয়েছে; যার ফলে রহিম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ এবং সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত ও দণ্ডিত হতে পারেন।
উপরের প্রত্যেকটি অপরাধের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন। ফলে, আদালত কর্তৃক শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মাপকাঠি অনুসরণ করতে হবে। এ অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রত্যেকটিই প্রকোপন (aggravating circumstances) পরিস্থিতি।
কিছু কিছু অপরাধ রয়েছে যা ভিকটিমকে জীবন্মৃত করে দেয়। ভিকটিম বেঁচে থাকেন কিন্তু সারাজীবনের জন্য মারা যান। তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হয় মৃত্যুর মতো। তাকে সারাজীবন অপরাধের চিহ্ন এবং ক্ষত বহন করতে হয়। ভিকটিম সামাজিক নিগ্রহের শিকার হন। পেশা, বিবাহিত জীবনযাপনের অনুপযুক্ত হন। ভিকটিম প্রবলভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতির শিকার হন, যার ক্ষতিপূরণ টাকা দিয়ে পরিশোধ সম্ভব হয় না।
এই ধরনের অপরাধের উদাহরণ হলো এসিড নিক্ষেপ। তীব্র ঘৃণা কিংবা প্রতিশোধ গ্রহণের ইচ্ছে থেকে ভিকটিমকে সারাজীবনের জন্য অকর্মণ্য, পঙ্গু করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই ধরনের জঘন্য অপরাধ করা হয়। এসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২ এর ৫(ক) ধারায় এই অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এই আইনে ক্ষতির পরিমাণ অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রয়েছে। এই আইন প্রয়োগের উদাহরণ হলো—Akbar Ali (Md) alias Jelhaque Mondal vs State, 77 DLR (AD) 96 মামলা।
এই মামলায় ভিকটিম ছিলেন অভিযুক্তের স্ত্রী। ১৮-০২-২০০৮ খ্রিঃ তারিখ তিনি অভিযুক্তের সাথে ঘুমাতে যান। রাত অনুমান ২:০০ ঘটিকার দিকে তিনি তার স্বামীকে বিছানায় না পেয়ে খোঁজ করেন। এক পর্যায়ে অভিযুক্ত ফিরে আসেন। ভিকটিম কোথায় গিয়েছিলেন জিজ্ঞাসা করলে ভিকটিমের সাথে অভিযুক্তের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। এক পর্যায়ে অভিযুক্ত ভিকটিমের দিকে এসিড ছুড়ে মারেন, যাতে ভিকটিমের মুখ, বাম কান, দুই হাত, বাম কাঁধ, মাথার বাম পাশ, বুক এবং গলা ঝলসে যায়। এসিড ছুড়ে অভিযুক্ত ঘর থেকে পালিয়ে যান।
ভিকটিমের আর্তচিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন এবং ভিকটিমের গায়ে পানি ঢালেন। ভিকটিমকে পাবনা হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সংবাদ পেয়ে ভিকটিমের পিতা এসে ভিকটিমকে হাসপাতালে দেখেন এবং মামলার এজাহার রুজু করেন। ভিকটিমের অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেলে রেফার করা হলে ভিকটিম দীর্ঘ সময় বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। মামলাটিতে রাষ্ট্রপক্ষে ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৩ জন সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
চিকিৎসক পিডব্লিউ-২৩ এর বক্তব্য অনুযায়ী ভিকটিমের শরীরে এসিড বার্নজনিত আঘাত ছিল। রিপোর্ট অনুযায়ী ভিকটিমের শরীরে—
1. Type of injury: burn by corrosive agent.
2. Nature of injury: Mixed type burn almost deep.
3. Area involved: About 20%.
4. Colour of skin: Black.
5. Age of injury: about 1 day.
6. Name of involved area.
9. Lesion involved her whole face, nose and both eyes. Eyes look ground glass appearance. Both lips of mouth swollen severely. Both ears affected. Left ear totally involved, part of scalp, neck was involved with trickling sign. Both hands involved with trickling signs. Part of her trunk including both breast with trickling sign. Left shoulder with trickling sign.
10. Her condition was dangerous. After primary treatment and resuscitation her condition underwent two long operations on 23-2-2008 and 3-3-2008. Her left ear totally damaged. She will need further surgical treatment. Her eyes condition is not good. There may be totally vision loss.”
অভিযুক্ত ভিকটিমের সাথে ঘটনার সময়ে একই ঘরে থাকায় ভিকটিম কীভাবে এসিডদগ্ধ হয়েছেন তা ব্যাখ্যা করার ভার অভিযুক্তের উপর বর্তায়। কিন্তু অভিযুক্তের নিকট কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। ভিকটিম এবং ঘটনার পরপর ছুটে আসা প্রতিবেশীরা বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য প্রদান করেছিলেন, যা হতে আপিল বিভাগ নিশ্চিত হন যে—শুধুমাত্র অভিযুক্ত এবং অভিযুক্তই এ অপরাধ করেছেন।
ভিকটিমের দুচোখ সাদা কাঁচের মতো সম্পূর্ণ সাদা হয়ে গিয়েছিল। উভয় ঠোঁট, মুখ দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল। উভয় কান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং বাম কান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। উভয় হাত, উভয় স্তন, বাম কাঁধ, ভিকটিমের পশ্চাদ্দেশে পোড়া কালো দাগ ছিল। ভিকটিমের শরীরে দুদফা অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। চিকিৎসক আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে ভিকটিম উভয় চোখের দৃষ্টি হারাবেন। দৃষ্টি হারিয়েছিলেন কিনা তা রায়ে উল্লেখ করা হয়নি।
তবে চিকিৎসা সংক্রান্ত রিপোর্ট হতে ভিকটিমের শরীরে যে আঘাতের বর্ণনা পাওয়া যায়, অন্তশ্চক্ষুতে তা ভয়ংকর নির্মম মর্মে প্রতীয়মান হয়। এটি একটি পৈশাচিক, শয়তানসুলভ অপরাধ। অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালতের সামনে প্রশ্ন ছিল—বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করায় তা বহাল রাখা যায় কিনা?
এই বিষয়ে আদালত বিস্তারিত আলোচনা করেন। আদালত বলেন—
13. Present case is a glaring example of brutal inhuman attack with acid on a young girl of hardly 18 years. The case of the acid attack is an example of uncivilized and heartless crime. Such crime does not deserve any kind of clemency when there is medical evidence that there was an acid attack on the young girl, an examinee of S.S.C. examination, and that circumstances having brought home by cogent evidence, there is no justification to reduce the sentence. The incidents of acid burning cause physical, mental and psychological torture. The victim of acid burn is stigmatized and traumatized. This Court cannot be oblivious of the situation that the victim must have suffered an emotional distress which cannot be compensated. The damage caused by the accused throwing acid on the victim is immense. The Court must not only keep a keen view of the rights of the criminal, but also of the right of the victim of the crime and the society at large while considering the imposition of appropriate sentence. As throwing acid on a young girl is not less dangerous than murder and the same cannot be tolerated by any father, mother, brother and sisters of the girl and the society at large. It would be a mockery of justice to permit the appellant to escape the extreme penalty of law. In order to curb and control the increasing rate of acid attacks, an exemplary punishment was required to be awarded and the courts below rightly did the same.
আদালতের পর্যালোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আদালত ভিকটিমের বয়স বিবেচনা করেছেন। ভিকটিমের বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর এবং সে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। কিন্তু সামান্য কারণে অভিযুক্ত ভিকটিমের জীবন ওলট-পালট করে দিয়েছেন। অভিযুক্ত ছিলেন ভিকটিমের স্বামী। তার দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল ভিকটিমকে রক্ষা করা। কিন্তু তিনি নিজেই ভিকটিমের উপর চরম আঘাত করেছেন।
ভিকটিমের মেডিকেল রিপোর্টে আঘাতের যে ভয়াবহ বিবরণ পাওয়া যায় তা ভয়ানক। ভিকটিম কানের শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন, পুরো শরীরে এসিডের ক্ষত বহন করছেন। তিনি বেঁচে আছেন, কিন্তু সেটি মরে যাওয়ার সমান। আদালত ভিকটিমের অবস্থা বিবেচনা করেছেন। আদালতের মতে কারো উপর এসিড নিক্ষেপ করা তাকে হত্যা করার সমান।
অভিযুক্ত ভিকটিমকে এমন আঘাত করেছেন যা কোনো পিতা-মাতা, ভাই-বোন কিংবা সমাজ গ্রহণ করবে না। স্ত্রীর সাথে সামান্য ঝগড়ার কারণে কোনো স্বামী স্ত্রীকে এসিডে ঝলসে দিতে পারেন—এটি কোনো মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। এসিড কোনো সহজলভ্য বস্তু নয়; কিন্তু অভিযুক্ত সেটি নিজের দখলে রেখেছেন এবং নিজের স্ত্রীকে এসিডে ঝলসে দিয়েছেন।
অভিযুক্ত তার অপরাধের মাধ্যমে নিজেকে স্পষ্টভাবে সমাজের কলঙ্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার উপস্থিতির কারণে সমাজ আতঙ্কিত হবে এবং সমাজ কখনোই তাকে গ্রহণ করবে না। একই ঘরে অভিযুক্ত থাকলেও স্ত্রীর এসিডে ঝলসে যাওয়া সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করেননি। এসিডে ঝলসে যাওয়ায় ভিকটিম শারীরিক, মানসিক ও সাইকোলজিক্যালি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অভিযুক্ত ভিকটিমকে মেরে ফেলা ব্যতীতই জীবন্মৃত করে ছেড়ে দিয়েছেন।
সুতরাং, এই মামলার অপরাধ সংক্রান্ত পরীক্ষার ফলাফল ১০০%।
অভিযুক্ত তার অপরাধের স্বপক্ষে কোনো ব্যাখ্যা দিতে যেমন অক্ষম ছিলেন, তেমনি কোনো প্রশমনমূলক পরিস্থিতিও (mitigating circumstances) উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সুতরাং, মামলাটির ক্রাইম টেস্ট ছিল ০%।
স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে এসিডে ঝলসে দেওয়া বিরল থেকে বিরলতর (Rarest of the Rare) অপরাধ। ফলে মামলাটির R-R test ছিল ১০০%।
১৮ বছর বয়সে স্বামীর সংসার করতে গিয়ে অভিযুক্তের অপরাধের কারণে ভিকটিম নিজের জীবন হারানো ব্যতীত সব কিছুই হারিয়েছেন। এটি বাইরের কেউ করেনি; ভিকটিমের সবচেয়ে প্রিয়জনই ভিকটিমকে জীবন্মৃত করে দিয়েছেন।
সুতরাং, এই আইন অনুযায়ী এ অপরাধের একটি মাত্র শাস্তিই হতে পারে এবং সেটি মৃত্যুদণ্ড। আদালত বলেছেন, আদালতের দায়িত্ব শুধুমাত্র অপরাধীকে দেখা নয়, বরং ভিকটিমকেও ন্যায়বিচার প্রদান করা—যাতে বিচার দেখে সমাজও বুঝতে পারে যে বিচার হয়েছে। একইভাবে সমাজে বসবাসকারী সম্ভাব্য অপরাধীও যেন শাস্তি সম্পর্কে জানতে পারে এবং অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে অবগত হয়।
অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড ব্যতীত অন্য কোনো শাস্তি প্রদানের কোনো কারণ ছিল না। এমতাবস্থায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে আপিল বিভাগ অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং অভিযুক্তের আপিল নামঞ্জুর করেন।
লেখক : আবদুল্লাহ আল মামুন, জেলা ও দায়রা জজ, (বিচারক, শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল), লক্ষ্মীপুর।

