ভারতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত ‘নিষ্কৃতি মৃত্যু’ বা প্যাসিভ ইউথানেসিয়া নিয়ে এক নজিরবিহীন রায় দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। ১৩ বছর ধরে বিছানায় অসাড় অবস্থায় শুয়ে থাকা ৩১ বছর বয়সী যুবক হরিশ রানার ক্ষেত্রে তাঁর মা–বাবার আবেদনে সাড়া দিয়ে প্যাসিভ ইউথানেসিয়ার অনুমতি দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট।
গত বুধবার (১১ মার্চ) বিচারপতি J. B. Pardiwala ও বিচারপতি K. V. Viswanathan–এর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দেন। আদালত রায়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে এই সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মর্যাদার সঙ্গে নিষ্কৃতি মৃত্যু নিশ্চিত করতে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
ভারতে বহু বছর ধরে এ নিয়ে বিতর্ক চলছে—যে ব্যক্তি বাইরের জগৎ বা নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ চেতনাহীন, যার সুস্থ হয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নেই এবং যিনি কেবল কৃত্রিম ব্যবস্থার মাধ্যমে বেঁচে আছেন, তাঁর নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকার থাকা উচিত কি না। এতদিন পর্যন্ত এ বিষয়ে আইন ও আদালতের অবস্থান ছিল অনির্দিষ্ট, আর সরকারও কোনো আইন প্রণয়ন করেনি। এই বাস্তবতায় হরিশ রানার মা–বাবার আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের সম্মতি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আদালত রায়ে নির্দেশ দিয়েছেন, হরিশ রানাকে দিল্লির All India Institute of Medical Sciences–এ (এইমস) ভর্তি করতে হবে। সেখানে একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনার মাধ্যমে মর্যাদার সঙ্গে তাঁর শরীরে চালু থাকা লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে এর আগে চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ মেডিক্যাল বোর্ডকে নিশ্চিত করতে হবে যে রোগীর সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
হরিশ রানা পাঞ্জাবের Chandigarh University–এর শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০১৩ সালে ছাত্রাবাসের পাঁচতলা থেকে পড়ে গিয়ে তিনি মাথায় গুরুতর আঘাত পান। চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় প্রাণে বেঁচে গেলেও পরে তিনি ‘কোয়াড্রিপ্লেজিয়া’ বা সর্বাঙ্গ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। তখন থেকে তাঁর শ্বাস–প্রশ্বাস, খাওয়া–দাওয়া—সবকিছুই কৃত্রিম উপায়ে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথমে হাসপাতালে এবং পরে নিজের বাড়িতে রেখে তাঁর চিকিৎসা চলতে থাকে।
আরও পড়ুন : ঈদের ছুটিতে হাইকোর্টে দুই ধাপে ১২ বেঞ্চে চলবে বিচারকাজ
গত ১৩ বছর ধরে চিকিৎসার বিপুল ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে হরিশের মা–বাবাকে নিজেদের বাড়িও বিক্রি করে দিতে হয়েছে। বর্তমানে ছোট ছেলের আয়ের ওপর নির্ভর করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন তাঁরা। অসুস্থ ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নিজেদের বয়সজনিত দুর্বলতার কারণে তারা আদালতের দ্বারস্থ হন।
এর আগে ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট হরিশের পরিবারের আবেদন গ্রহণ করেননি। সে সময় আদালত এই মামলাকে ‘অত্যন্ত কঠিন সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছিলেন, রোগীকে বাড়িতেই রাখতে হবে এবং চিকিৎসকেরা নিয়মিত গিয়ে তাঁর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবেন।
তবে এবার হরিশের মা–বাবার আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত নতুন করে বিষয়টি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, তাঁদের মৃত্যুর পর অসুস্থ ছেলেকে কে দেখবে এবং কীভাবে চলবে চিকিৎসার ব্যয়—এই অনিশ্চয়তা তাদের ভীষণভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছে। পাশাপাশি হরিশের শারীরিক অবস্থাও দিন দিন আরও অবনতি হচ্ছে।
আবেদনে তাঁরা বলেন, এই পরিস্থিতিতে ছেলের কষ্ট লাঘবের একমাত্র উপায় মৃত্যু। তবে সেই মৃত্যু যেন প্রত্যক্ষ না হয়। অর্থাৎ কোনো ইনজেকশন বা ওষুধ প্রয়োগ করে মৃত্যু নয়, বরং লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুর সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানান তাঁরা। বিচারপতিরা সেই অনুরোধ মেনে প্যাসিভ ইউথানেসিয়ার অনুমতি দেন।
ভারতে এখনো প্রত্যক্ষ মৃত্যু বা অ্যাকটিভ ইউথানেসিয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আর প্যাসিভ ইউথানেসিয়ার ক্ষেত্রেও আদালত এতদিন খুব সীমিত পরিস্থিতিতে মত দিয়েছেন। রায় দিতে গিয়ে বিচারপতিরা বলেন, হরিশের চিকিৎসার দীর্ঘ ইতিহাস, তাঁর ভবিষ্যৎ এবং রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করেই তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রায়ে ২০১৮ সালের গুরুত্বপূর্ণ Common Cause vs Union of India (2018) মামলার উল্লেখও করেন বিচারপতিরা। ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের আলোকে ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার’কে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

