জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ইফফাত জাহান বিথীর ওপর নির্মম নির্যাতন, সহিংসতা এবং প্রতিবন্ধিতার ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে কার্যকর প্রতিকার চেয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৬ মার্চ) প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ রেজাউল করিম সিদ্দিকী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, প্রক্টর, আইন অনুষদের ডিন, বীরপ্রতীক তারামন বিবি হলের প্রভোস্ট এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের সহ-সভাপতির কাছে এ স্মারকলিপি প্রদান করেন।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ইফফাত জাহান বিথী (রোল নং ৭৯১) বীরপ্রতীক তারামন বিবি ছাত্রীনিবাসের ১০১৫ নম্বর কক্ষে বসবাস করতেন। গত ১০ মার্চ একই কক্ষের বাসিন্দা আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস শ্রাবণীর বিরুদ্ধে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে কক্ষের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতেন এবং নিয়মিত মাদক সেবন করতেন। এমনকি অনুমতি ছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বিথীর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ব্যবহার ও স্থানান্তর করে তাকে মানসিকভাবে হয়রানি করা হতো। এ বিষয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে হল প্রভোস্টের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ না থাকায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থী প্রশ্রয় পেয়ে ১০ মার্চ বিথীর ওপর শারীরিক হামলা চালায়। এতে তিনি নীলাফোলা জখম ও মানসিক আঘাতের শিকার হন এবং আতঙ্কে হল ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
আরও পড়ুন : আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় বৃদ্ধির জন্য অনলাইন ব্যবস্থা চালু করল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড
এছাড়া অভিযোগ করা হয়, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী অন্য এক শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করে বিথীর বিরুদ্ধে উল্টো মিথ্যা অভিযোগ দাখিল করেন। পরে ১২ মার্চ হলের তদন্ত কমিটির সভাপতি ও ওয়ার্ডেনের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিথীকে সাত দিনের মধ্যে ওই অভিযোগের বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। এতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শুধু নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থই হয়নি, বরং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এর ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষার সব স্তরে উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে একীভূত বা সমন্বিত শিক্ষায় অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে। একই আইনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের জন্য উপযোগী পরিবেশ ও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। এছাড়া আইনের ৩৬ ধারায় এসব অধিকার লঙ্ঘনকে প্রতিবন্ধিতার ভিত্তিতে বৈষম্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যা আইনত নিষিদ্ধ।
এ অবস্থায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ইফফাত জাহান বিথীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চারটি দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস শ্রাবণীর বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত করে প্রচলিত আইনে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
এছাড়া তাকে ১০১৫ নম্বর কক্ষ থেকে বহিষ্কার করে সেখানে প্রতিবন্ধীবান্ধব ও সংবেদনশীল শিক্ষার্থী ছাড়া অন্য কাউকে বরাদ্দ না দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়েছে, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং অভিযুক্ত বা তার সহযোগীরা যেন কক্ষ, হল, শ্রেণিকক্ষ কিংবা ক্যাম্পাসের কোথাও তার ওপর আক্রমণ করতে না পারে সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ সব ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বৈষম্যমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, এসব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মানবিক ভূমিকা পালন করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

