আখতার জাবেদ : বাংলাদেশ বার কাউন্সিল -বাংলাদেশে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী ও তত্ত্বাবধানকারী একটি বিধিবদ্ধ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। ১৫ সদস্য নিয়ে বার কাউন্সিল গঠিত; তন্মধ্যে ১৪ জন নির্বাচিত সদস্য (৭ জন সাধারণ ও ৭ জন জোনাল), আর বাংলাদেশের মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেল পদাধিকারবলে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। ১৪ জন নির্বাচিত সদস্যদের মধ্য থেকে একজন ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মেয়াদ তিন বছর।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে আইনজীবীদের তালিকাভুক্তি ও সনদ প্রদান, আইনজীবীদের পেশাগত আচরণ (Code of Conduct) নিয়ন্ত্রণ, প্রমাণ সাপেক্ষে পেশাগত অসদাচরণের (Professional Misconduct) বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, বাস্তবভিত্তিক আইন শিক্ষার মানোন্নয়ন ও তার প্রসার, এবং স্থানীয় আইনজীবী সমিতিসমূহের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান, এসবই বার কাউন্সিলের প্রধান দায়িত্ব।
বার কাউন্সিল একটি অত্যন্ত মর্যাদাবান প্রতিষ্ঠান। আইনজীবীগণ সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি -যাদের নামের আগে ‘Learned’ তথা ‘বিজ্ঞ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়; এটি কেবল একটি বিশেষণ নয়, বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও পেশাগত নৈতিকতার প্রতীক। তবে দুঃখজনকভাবে, অতীতে বার কাউন্সিল তার সব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি -এমন ধারণা সমাজে গড়ে উঠেছে, বদ্ধমূল হয়েছে । ফলত ‘Learned’ বা ‘বিজ্ঞ’ শব্দটির সামাজিক ও নৈতিক ওজন অনেকাংশে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো -অতীতে আদালতের ভেতরে এবং বাইরে আইনজীবীদের পেশাগত অসদাচরণের ঘটনা কম ঘটেনি; বরং বহুক্ষেত্রে তা দৃশ্যমান ও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে, হয়েছে সমালোচিত । কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এসব ক্ষেত্রে বার কাউন্সিল অনেক সময় কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ না করে নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল -এমন অভিযোগও শোনা যায়।
এখানে একটি মৌলিক সত্য স্মরণ রাখা জরুরি: যে কোনো পেশায় খারাপ মানুষের সংখ্যা খুবই অল্প, কিন্তু তাদের প্রভাব বিস্তার হয় বিস্তৃত পরিসরে। ফলে অল্পসংখ্যক দুষ্টু ও অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ড পুরো পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
এক্ষেত্রে সময়োপযোগী, নিরপেক্ষ ও দৃঢ় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই হতে পারে উত্তরণের পথ। কারণ, কয়েকজন দুষ্টু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নেওয়া মানে পুরো পেশার মর্যাদা রক্ষা করা, প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। অন্যথায়, একটি শক্তিশালী ও মর্যাদাবান প্রতিষ্ঠানও ক্রমে ‘দন্তহীন বাঘে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
আরও পড়ুন : স্বাগতম ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল: মেধা ও নিষ্ঠার স্বীকৃতিতে নতুন জনপ্রত্যাশা
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি -অধিকাংশ আইনজীবীই দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক। তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সহযোদ্ধা। কিন্তু কিছু বিচ্ছিন্ন (বিচ্ছিন্ন, এ শব্দ নিয়ে হয়তো অনেকই দ্বিমত পোষণ করতে পারে) নেতিবাচক আচরণ পুরো আইনজীবী সমাজকে কলঙ্কিত করে ফেলে -যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
তবে আশার কথা -সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেল, যিনি পদাধিকারবলে বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, তিনি যোগ্যতা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার বিচারে অত্যন্ত সক্ষম নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁর সম্ভাবনাময় নেতৃত্বে বার কাউন্সিল তার ঐতিহ্য ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবে -এমন প্রত্যাশা করা অমূলক নয়।
বিশেষত, পূর্বের Bar Vocational Training Course (BVTC) পুনরায় চালু করা সময়ের দাবি। কারণ, কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান একজন আইনজীবীকে পূর্ণতা দেয় না; আইনের প্রকৃত শক্তি নিহিত তার বাস্তব প্রয়োগে। বইয়ের কালো হরফের আইন এবং বাস্তব জীবনের প্রয়োগিক আইনের মধ্যে বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে যে বিশাল ব্যবধান, তা অনস্বীকার্য। এই ব্যবধান ঘোচাতে তাত্ত্বিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতার একটি কার্যকর ও সুষম সমন্বয় অপরিহার্য।
এক্ষেত্রে বার কাউন্সিল যদি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কার্যকর সমন্বয় স্থাপন করতে পারে, তবে আইন শিক্ষার্থীরা প্রায়োগিক আইনজগতে প্রবেশের পূর্বেই বাস্তবতার সঙ্গে আইনের সংযোগ অনুধাবন করতে সক্ষম হবে। এর ফলে তারা শুধু ‘জানবে’ না -বরং ‘প্রয়োগ করতে’ শিখবে, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত।
বর্তমানে বার কাউন্সিলের পরীক্ষা পদ্ধতি ও সনদ প্রদান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে- যা দূর করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, একজন আইনজীবী সনদ অর্জনের পরও যদি সমাজে যথাযথ মর্যাদা না পান, তবে তা কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো পেশার জন্যই অমর্যাদাকর। অথচ বাস্তবতা হলো, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আইনজীবীদের ভূমিকা অপরিহার্য। বিচারক ও আইনজীবী-এই দুই পক্ষকে প্রায়ই একটি পাখির দুটি ডানার সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, একটি ডানা দুর্বল হলে পাখির উড্ডয়ন সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন : ‘গণঅভ্যুত্থান হলে সংবিধান অটোমেটিক অকার্যকর হয়’—এই ধারণার সমালোচনা
বিচারকদের ক্ষেত্রে কঠোর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পাশাপাশি ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে-এমনকি অবসরকাল পর্যন্তও। কিন্তু একজন আইনজীবী সনদ লাভের পর তাঁর দক্ষতা উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক, বাধ্যতামূলক ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের অভাব সুস্পষ্ট। এই বাস্তবতা বিবেচনায় এনে সনদ-উত্তর প্রশিক্ষণ, Continuing Legal Education (CLE) এবং ব্যবহারিক দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সুসংগঠিত কর্মসূচি গ্রহণ করা শুধু সময়োপযোগী উদ্যোগ নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতায় ফরজে আইনের মতো বিষয়
আইনজীবীদের সংখ্যা বিবেচনায় রেখে, বার কাউন্সিল স্থানীয় আইনজীবী সমিতি ও আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিকেন্দ্রীভূত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও চালু করতে পারে। এতে একদিকে যেমন দক্ষতা বাড়বে, অন্যদিকে পেশার প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠিত হবে।
সবশেষে বলা যায়- আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়, সম্ভবও নয় ; এটি একটি সম্মিলিত প্রক্রিয়া। বার কাউন্সিল, বিচার বিভাগ, আইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আইনজীবী সমাজ- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।
মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেলের বিচক্ষণ নেতৃত্বে বার কাউন্সিল যদি তাত্ত্বিক জ্ঞান ও ব্যবহারিক প্রজ্ঞার সমন্বয়ে আইনজীবীদের পেশাগত সদাচারণ নিশ্চিত করে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, তবে ‘Learned’ শব্দটি তার প্রকৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবে, এবং আইন পেশা আবারও সমাজে জনআস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।
ন্যায়বিচারের স্বার্থে, পেশার মর্যাদার স্বার্থে, এবং একটি উন্নত আইনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে -এই সংস্কারগুলো এখন সময়ের দাবি।
লেখক : সিনিয়র সিভিল জজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

