নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা আইনজীবী সমিতি ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আইনজীবীদের স্বাধীনভাবে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রদান ও মনোনয়ন বাতিলের ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ২ লক্ষাধিক সলিসিটরের প্রতিনিধিত্বকারী পেশাজীবী সংগঠন ‘দ্য ল’ সোসাইটি’। সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়ে এই বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ল’ সোসাইটির সভাপতি মার্ক ইভান্স স্বাক্ষরিত ওই পত্রে বলা হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সমর্থিত বহু আইনজীবী এবং বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে বিভিন্ন বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। অনেককে মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেওয়া হয়নি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রার্থীরা শারীরিক হয়রানির শিকার হয়েছেন।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, “ফ্যাসিবাদের সহযোগী” আখ্যা দিয়ে অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ কিছু প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করেছে অথবা পূর্ববর্তী সরকারের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে নির্বাচনে অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে বলেও অভিযোগ পেয়েছে ল’ সোসাইটি।
জাতিসংঘের নীতিমালার আলোকে ল’ সোসাইটির আইনি ব্যাখ্যা
যুক্তরাজ্যের এই শীর্ষ আইনি সংগঠনটি স্পষ্ট জানিয়েছে, উথাপিত অভিযোগগুলো জাতিসংঘের “আইনজীবীদের ভূমিকা সম্পর্কিত মৌলিক নীতিমালা”-এর ১৬, ১৭, ১৮ এবং ২৩ নম্বর নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
-
নীতিমালা ১৬ (পেশাগত স্বাধীনতা): এই নীতি অনুযায়ী, সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন আইনজীবীরা ভয়ভীতি, বাধা, হয়রানি বা অনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া দায়িত্ব পালন করতে পারেন। মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া বা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ প্রয়োগ করা এই নীতির সরাসরি লঙ্ঘন, যা আইন পেশার স্বশাসনকে খর্ব করে।
-
নীতিমালা ১৭ (নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ): নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় শারীরিক হয়রানি ও ভয়ভীতির অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইনজীবীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে রাষ্ট্রকে যথাযথ সুরক্ষা দিতে হবে, যা এখানে লঙ্ঘিত হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে পুলিশি চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
-
নীতিমালা ১৮ (মক্কেলের সাথে একীভূত না করা): আইনজীবীদের তাঁদের মক্কেলের রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে মিলিয়ে দেখা যাবে না। প্রার্থীদের “সহযোগী” বা “দোসর” আখ্যা দেওয়া এই নীতির পরিপন্থী। এটি আইনজীবীদের পেশাগত আচরণকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে শাস্তির ঝুঁকি তৈরি করে, যার ফলে আইনজীবীরা নির্দিষ্ট মতের পক্ষে আইনি সহায়তা দিতে ভয় পাবেন।
-
নীতিমালা ২৩ (মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা): অন্যান্য নাগরিকদের মতো আইনজীবীদেরও সংগঠন গঠন ও বার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মৌলিক অধিকার রয়েছে। নির্বাচনে হস্তক্ষেপ এই স্বাধীন পরিচালনার অধিকারকে দুর্বল করে দেয়।
ল’ সোসাইটির মতে, এই ধারাবাহিক হস্তক্ষেপের ফলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়বে।
চিঠিতে বাংলাদেশের বর্তমান কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রধানত তিনটি আহ্বান জানানো হয়েছে:
১. সকল আইনজীবীর সম-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন পরিবেশে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
২. সংশ্লিষ্ট সকল আইনজীবী সমিতিতে ঘটে যাওয়া নির্বাচনী অনিয়ম, বাধা, হয়রানি ও সহিংসতার অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে।
৩. আইনজীবীরা যেন কোনো ধরনের প্রতিশোধ, বাধা, ভয়ভীতি বা হয়রানির আশঙ্কা ছাড়াই স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা ও সততা অক্ষুণ্ণ থাকে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছাড়াও এই চিঠির অনুলিপি যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশ হাইকমিশন, ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশন, জেনেভায় জাতিসংঘের স্থায়ী মিশন এবং জাতিসংঘের বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক অধ্যাপক মার্গারেট স্যাটারথওয়েইট-এর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

