“এখন বেঁচে থাকা অসম্ভব,” আত্মহত্যার কয়েক দিন আগে নিজের শেষ ফোন কলে বাবাকে এভাবেই আক্ষেপ করেছিলেন দিল্লিতে কর্মরত বিচারক আমান শর্মা। পরিবারের অভিযোগ, স্ত্রীর হাতে নিজের বাবার অপমান সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
আলোয়ারের বাসিন্দা এবং দিল্লিতে কর্মরত বিচারক আমান শর্মা গতকাল ২ মে আত্মহত্যা করেন। তাঁর মরদেহ আলোয়ারে নিয়ে আসা হয় এবং আজ রোববার (৩ মে) সেখানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। তাঁর বাবা, আইনজীবী প্রেম কুমার শর্মা, ছেলের মুখাগ্নি করেন।
পরিবারের ভাষ্যমতে, আমানের উপস্থিতিতে তাঁর স্ত্রী তাঁর বাবাকে অপমান করায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তারা জানান, এই লাঞ্ছনা তিনি সহ্য করতে পারেননি এবং চরম পথ বেছে নেন। অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি বাথরুম থেকে একটি টুল এনে এবং নিজের ঘরের একটি শাল ব্যবহার করে গলায় ফাঁস দেন।
মৃত্যুর দুই দিন আগে আমান তাঁর বাবাকে ফোন করে বলেছিলেন যে তিনি আর বাঁচতে চান না এবং এটিই তাঁর শেষ কল। এ কথা শুনে তাঁর বাবা তৎক্ষণাৎ দিল্লিতে ছুটে আসেন। রাজেশ নামে এক আত্মীয় জানান, আমান ব্যক্ত করেছিলেন যে তাঁর পক্ষে বেঁচে থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না।
পরিবারের অভিযোগ, আমান মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন এবং পারিবারিক কলহের কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। তাদের দাবি, জম্মু-কাশ্মীরে কর্মরত তাঁর শ্যালিকা (একজন আইএএস কর্মকর্তা) আমানের স্ত্রীকে প্ররোচিত করতেন এবং উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতেন। তারা আরও জানান যে, ওই শ্যালিকা তাঁর স্বামী (দিল্লি পুলিশের একজন সিনিয়র আইপিএস কর্মকর্তা) থেকে আলাদা থাকেন। ঘটনার সময় আমানের স্ত্রীর পক্ষ থেকে আরও একজন আত্মীয় ওই বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন : ঢাকায় সিসি ক্যামেরায় ট্রাফিক মামলার ডিজিটাল যুগে পদার্পণ: জরিমানা না দিলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
২ মে বিকেলে আমান বাথরুমের একটি টুল নিয়ে নিজের ঘরে একটি শালের সাহায্যে ফাঁস দেন। তাঁর বাবা জানান, তিনি তখন ঘরের বাইরে ছিলেন এবং ভেতর থেকে চিৎকার শুনতে পান, যেখানে আমানের স্ত্রী সম্ভবত তাঁর সাথে তর্ক করছিলেন।
ঘটনার পর আমানের স্ত্রী তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে যান। শ্বশুরবাড়ির পক্ষের কেউ শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলেন না। তবে দিল্লি, হরিয়ানা এবং রাজস্থান ক্যাডারের বেশ কয়েকজন সিনিয়র বিচারক শেষকৃত্যে অংশ নিতে আলোয়ারে পৌঁছান।
পরিবার এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তারা বিষয়টিকে একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে অভিহিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেন, যে মানুষটি ন্যায়বিচার প্রদান করেন, তাঁর সাথে যদি এমনটি ঘটতে পারে, তবে তা যে কারোর সাথেই ঘটতে পারে।
তারা আরও জানান যে, আমানের ছোট ভাই একটি সড়ক দুর্ঘটনার পর থেকে বিষণ্নতায় ভুগছেন এবং এলএলবি পড়ছিলেন। তাঁর বাবা জানান, পরিবারে তিনি আগেই অনেক কষ্ট দেখেছেন এবং সবসময় চেয়েছিলেন আমান যেন সুখে থাকে।
প্রেম কুমার শর্মা বলেন, তিনি প্রথমে আমানের বিয়ে তাঁর এক বন্ধুর মেয়ের সাথে ঠিক করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমান তাঁর ব্যাচমেটকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। ছেলের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পরিবার হিন্দু রীতি অনুযায়ী বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি আরও যোগ করেন যে, আমান কখনো নিজের ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে কথা বলতেন না; তিনি স্বভাবগতভাবে শান্ত ছিলেন এবং সবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
প্রসঙ্গত, আমান কুমার শর্মা ২০২১ সালের ১৯ জুন দিল্লি জুডিসিয়াল সার্ভিসে যোগদান করেছিলেন। তিনি পুনের সিম্বায়োসিস ল স্কুল থেকে স্নাতক এবং ২০১৮ সালে বিএ এলএলবি সম্পন্ন করেন। বিচারকের দায়িত্ব পালনকালে আমান কুমার শর্মা বিভিন্ন ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন। তিনি প্রথম শ্রেণির জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও দেওয়ানি জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে আমান কুমার শর্মা উত্তর-পূর্ব জেলার করকরডুমা আদালতে জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের (ডিএলএসএ) পূর্ণকালীন সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

