হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চের প্রথম রায়ে স্ত্রী হত্যার আসামি খালাস

স্ত্রী হত্যায় ফাঁসির আসামি আব্দুল্লাহ হাইকোর্টে খালাস

কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | যশোরের অভয়নগরে ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে সংঘটিত বহুল আলোচিত স্ত্রী সবুরা বেগম হত্যা মামলায় অধস্তন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্বামী আব্দুল্লাহকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। ‘তদন্তে দুর্বলতা ও যথাযথ সাক্ষ্য না থাকায়’ উচ্চ আদালত আসামির ডেথ রেফারেন্স খারিজ করে এই খালাসের রায় প্রদান করেন।

গতকাল মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী এবং বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।

আদালতে খালাসপ্রাপ্ত আসামি আব্দুল্লাহর পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাসাদ্দর রায়হান খান। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক।

উল্লেখ্য, নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গত ১০ জুন দেশের প্রধান বিচারপতি একটি বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করেছিলেন। সেই বিশেষ বেঞ্চেই গত ১৪ জুন এই মামলার চূড়ান্ত আইনি শুনানি শুরু হয়েছিল। ফলে হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে নিষ্পত্তি হওয়া প্রথম মামলা এটি।

১৮ বছর আগের সেই ঘটনা ও নিম্ন আদালতের রায়

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০০৮ সালের ১৫ জানুয়ারি বিকেল ৩টার দিকে যশোরের অভয়নগর থানা এলাকার নিজ শয়নকক্ষে অগ্নিদগ্ধ হন সবুরা বেগম। এই ঘটনার ৬ দিন পর অর্থাৎ ২১ জানুয়ারি সবুরা বেগমের বাবা সামছুর শেখ বাদী হয়ে জামাই আব্দুল্লাহসহ কয়েকজনকে আসামি করে অভয়নগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

মামলা দায়েরের পরদিন ২২ জানুয়ারি অগ্নিদগ্ধ সবুরা বেগম চিকিৎসাধীন অবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে একটি জবানবন্দি প্রদান করেন। পরবর্তীতে ২৮ জানুয়ারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

এই ঘটনায় করা দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালে আসামি আব্দুল্লাহকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করেন যশোর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১।

পরবর্তীতে নিয়ম অনুযায়ী আসামির মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে এবং গ্রেফতারের পর আসামি আব্দুল্লাহ জেল আপিল দায়ের করেন।

যে কারণে সর্বোচ্চ সাজা থেকে খালাস

তদন্তের দুর্বলতা ও খালাসের আইনি যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক বলেন:

মামলায় অভিযোগ ছিল যৌতুক চেয়ে মৃত্যু ঘটনো। কিন্তু যৌতুক যে চেয়েছে সেটা প্রমাণ করতে পারেনি প্রসিকিউশন। হাত-পা বেঁধে মুখে কাপড় গুজে লেপ তোষকে কেরোসিন তেল দিয়ে আগুন দেওয়ারও একটা অভিযোগ আছে। স্বামী ঘটনাস্থলে ছিল বা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে এমন কিছু প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পারেনি। কী দিয়ে আগুন লাগিয়েছে সেটাও প্রমাণ করতে পারেনি। প্রসিকিউশন যদি একটা এভিডেন্স দিতো যে স্বামী ওখানে ছিল, একটা লাইন যদি কোনো সাক্ষী বলতো তাহলে সর্বোচ্চ সাজা হতো। ঘটনা রাতে হলেও তো হতো। ঘটনা ঘটেছে বিকেল তিনটা বাজে। আর আগুনে পুরো বসত বাড়ি পুড়ে গেছে। শুধু ভিকটিম পুড়ে গেছে, সেটা না।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষকে আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে’ (Beyond reasonable doubt) প্রমাণ করতে হবে। এই মামলায় ঘটনাটি গভীর রাতে নির্জন ঘরে নয়, বরং ভরদুপুরে বিকেল ৩টার সময় ঘটেছিল এবং আগুনে পুরো বসতবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। অথচ প্রসিকিউশন আসামির উপস্থিতি বা আগুন লাগানোর অকাট্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। ফলে একজন আসামিকে শুধুমাত্র অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ফাঁসি দেওয়া যায় না—এই আইনি নীতি অনুসরণ করেই হাইকোর্ট আব্দুল্লাহকে খালাস প্রদান করেছেন।