গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে সরকারি খাস জমি ও কয়েক লাখ টাকা মূল্যের মেহগনি গাছ রক্ষায় প্রশাসনিক গাফিলতি, রহস্যজনক ভূমিকা ও পরস্পরবিরোধী অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি পক্ষ সরকারি জমি ও গাছ গোপনে দখলে রাখলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি গেজেট, রেকর্ড ও নকশায় জমির অবস্থান স্পষ্ট থাকলেও সরেজমিন পরিমাপের সময় সাদুল্লাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন দাবি করেন, জমিটি “রাস্তায় মিশে গেছে” অথবা “খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না”। এমন বক্তব্য সরকারি রেকর্ড ও তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতা ও প্রশাসনিক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন যমুনা টেলিভিশন ও বাংলা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধি এবং শিক্ষানবিশ আইনজীবী মো. জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশ।
অভিযোগে বলা হয়, সাদুল্লাপুর মৌজার জেএল-৪১ এর বিআরএস ১ নং খতিয়ানভুক্ত ৫৮৯ নং দাগের ০.০০৫৬ একর সরকারি খাস জমি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে রয়েছে। ওই জমিতে থাকা প্রায় ৩ লাখ টাকা মূল্যের ৭টি বৃহদাকৃতির মেহগনি গাছও বর্তমানে ঝুঁকির মুখে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পৃথক দুটি আবেদনের পর বনগ্রাম ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও সার্ভেয়াররা সরেজমিন তদন্ত করে জমি ও গাছের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন। পরবর্তীতে ৩০ মার্চ ও ২ এপ্রিল ২০২৬ সালের তদন্ত প্রতিবেদনে (স্মারক নং-৩৩ ও ৩৮) সরকারি খাস জমি ও প্রায় ৩ লাখ টাকা মূল্যের ৭টি মেহগনি গাছের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গাছগুলো নিলামে বিক্রি করলে সরকারের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় সম্ভব।
আরও পড়ুন : আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ: প্রধানমন্ত্রীকে ইংল্যান্ডের ল’ সোসাইটির চিঠি
তবে তদন্তে সরকারি সম্পদের অস্তিত্ব নিশ্চিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো উদ্ধার বা সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের এক তদন্তে জমিটিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন দাবি করে সরকারের কোনো স্বার্থ নেই বলা হলেও পরবর্তীতে একই অফিসের স্মারক নং-৩০০ ও ৩১১ এর নোটিশে জমিটিকে সরকারি খাস জমি ও গাছগুলোকে সরকারি সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। প্রশাসনের এমন দ্বৈত অবস্থান নিয়ে এলাকায় তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এছাড়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের নোটিশে “সরকারি স্বার্থ” ও “গাছ” থাকার বিষয় লিখিতভাবে স্বীকার করলেও পরে সরেজমিনে এসে জমির অস্তিত্ব অস্বীকার করেন।
অভিযোগে স্থানীয় প্রভাবশালী জাকিউল হক মানিক, জাহিদুল ইসলামসহ তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকারি খাস জমি ও গাছ নিজেদের জমির সঙ্গে বাউন্ডারি দিয়ে দীর্ঘদিন দখলে রাখার অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে জাকিউল হক মানিক গত মার্চ মাসে জমি বন্দোবস্ত চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনে তিনি নিজেই তার মায়ের নামে বিআরএস খতিয়ান নং ২৩৮ এর ০০৩৬৯ একর জমির সঙ্গে অতিরিক্ত ০.০০৫৬ একর সরকারি খাস জমি ০০৪২৫ একর জমি তাদের ভোগদখলে থাকার কথা উল্লেখ করেছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সিএস ৫২৬ নং দাগের ২৪ শতক জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা চললেও বিআরএস ৫৮৯ নং দাগের সরকারি খাস জমি ওই মামলার অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ মামলার অজুহাতে সরকারি খাস জমি ও গাছ ব্যক্তি দখলে রাখার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরও পড়ুন : বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে তানভীর মোকাম্মেলের প্রামাণ্যচিত্র ‘একটি অনন্য গ্রন্থের জন্ম’: গণ-অর্থায়নের আহ্বান
এদিকে বৃহদাকৃতির মেহগনি গাছগুলো স্থানীয় বসতবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য চরম ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগকারী জানান, গত বছর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করলে দুই দফা তদন্ত হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২২ জুলাই চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গাছগুলোকে “ঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে চিহ্নিত করলেও এখন পর্যন্ত কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগকারী মো. জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশ বলেন, “আমার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়; সরকারি সম্পদ রক্ষা, সত্য উদঘাটন ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করা। মামলার আড়ালে খাস জমি গোপন বা দখলের সুযোগ নেই।”
অভিযোগকারীর দাবি, বাস্তবে সরকারি রেকর্ডভুক্ত জমি ও গাছ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তা অস্বীকার করা প্রভাবশালী মহলকে অবৈধ সুবিধা দেওয়ারই ইঙ্গিত বহন করে। সর্বশেষ সরেজমিন তদন্তের ফলাফল পুনর্বিবেচনার জন্য গত ২৯ এপ্রিল আবেদন করলেও অদ্যাবধি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে জমি পরিমাপ শেষে উপস্থিত উভয় পক্ষ ও স্থানীয়দের উদ্দেশে সাদুল্লাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন জানান, বিআরএস রেকর্ড অনুযায়ী হাল ৫৮৯ নং দাগে ০.০০৫৬ একর খাস জমির তথ্য পাওয়া গেলেও মাঠ পর্যায়ের মাপজোখে পুরো প্লটে মোট ২৪ শতাংশ জমি পাওয়া গেছে। জমি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে চলমান মামলার আরজি ও নথিপত্রও তিনি পর্যালোচনা করেন।
এসময় তিনি আরও মন্তব্য করেন, খাস জমি “নিষ্কণ্টক নয়” এবং হাফ শতকের বেশি জমি “রাস্তায় চলে যেতে পারে”। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ গাছের বিষয়ে আদালতের আদেশ ও নির্দেশনার প্রসঙ্গ তুলে তাৎক্ষণিক মন্তব্য এড়িয়ে যান।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ব্যক্তি মালিকানা নিয়ে মামলা থাকলেও খাস খতিয়ানভুক্ত জমি সরকারের সম্পদ। তাই সরকারি খাস জমি ও মেহগনি গাছ দ্রুত উদ্ধার, সংরক্ষণ ও সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

