জেলা আইনজীবী সমিতি ভবন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
জেলা আইনজীবী সমিতি ভবন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতিতে সালিস নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ; ৬ আইনজীবীসহ আহত ১২, আটক ৭

নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ |চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনের অভ্যন্তরে একটি দেওয়ানি ও বাণিজ্যিক বিরোধের সালিস বৈঠককে কেন্দ্র করে আইনজীবী ও বহিরাগতদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রড ও লোহার পাইপ নিয়ে উভয়পক্ষের এই দফায় দফায় মারামারিতে পুরো সমিতি ভবন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

এই সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ৬ জন আইনজীবীসহ উভয়পক্ষের ১০-১২ জন আহত হয়েছেন এবং ঘটনাস্থল থেকে ৭ জন বহিরাগতকে আটক করেছে পুলিশ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আইনজীবী সমিতি ভবনে আদালতের নির্দেশে চলা একটি মামলার আপস-মীমাংসার সালিস বৈঠক চলাকালীন এই নজিরবিহীন হামলার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে দ্রুত বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

আইনজীবী সমিতি ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সোনামসজিদ স্থলবন্দরে পাথরের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে টাকা-পয়সার লেনদেনের জেরে আদালতে একটি সিআর (CR) মামলা দায়ের করা হয়েছিল। আদালতের নির্দেশেই আইনজীবী সমিতি ভবনে মামলার বাদী ও বিবাদী উভয়পক্ষকে নিয়ে আইনি সালিস চলছিল। ওই মামলার বাদী স্বয়ং আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট মো. রাসেল আহম্মেদ রনি।

সালিস চলাকালীন আকস্মিকভাবে কিছু বহিরাগত ব্যক্তি জোরপূর্বক একটি সালিশনামায় (মীমাংসাপত্র) আইনজীবী রাসেল আহম্মেদ রনির স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে উপস্থিত আইনজীবীরা বাধা দিলে বহিরাগতরা উগ্র হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে উভয়পক্ষ বারের নির্মাণাধীন একটি ভবন থেকে রড ও লোহার পাইপ সংগ্রহ করে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বহিরাগতদের এই অতর্কিত ও লাঠিসোটা-রডের হামলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ বারের ৬ জন আইনজীবী গুরুতর আহত হন। আহত আইনজীবীরা হলেন— অ্যাডভোকেট আব্দুর বারী-১, অ্যাডভোকেট আব্দুর বারী-২, অ্যাডভোকেট বশির আহম্মেদ, অ্যাডভোকেট নাহিদ ইবনে মিজান, অ্যাডভোকেট ফরহাদ হোসেন এবং অ্যাডভোকেট সামিউল ইসলাম মিলন।

আরও পড়ুন : গুম রোধ ও মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রস্তাবিত আইন বাস্তবে কার্যকর হতে হবে : অ্যাটর্নি জেনারেল

আইনজীবীদের প্রতিরোধে বহিরাগতদের মধ্যেও কয়েকজন আহত হয়। আহত বহিরাগতদের মধ্যে দুজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঘটনার পরপরই আইনজীবী সমিতির সদস্যরা ধাওয়া দিয়ে ৭ জন বহিরাগতকে বারের ভেতরে আটকে রাখেন এবং পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একরামুল হোসাইন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, বর্তমানে আটককৃতদের মধ্যে ৫ জন থানা হাজতে এবং ২ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পুলিশি হেফাজতে রয়েছে।

রবিবার (১৭ মে) রাতে আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু হাসিব বাদী হয়ে এ ঘটনায় সদর থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেছেন।

তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ জানিয়েছেন, “আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দেওয়া এজাহারে কিছু আইনি বিষয় সংশোধন করতে বলা হয়েছে। এ কারণে এখনো মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে রুজু (নথিভুক্ত) হয়নি। তবে আটককৃতদের আজই আদালতে সোপর্দ করা হবে। মামলা রুজু হওয়া মাত্রই তাঁদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে।”

বিবাদী পক্ষের আইনজীবী মাসুদ রানা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, “সম্পূর্ণ বহিরাগতদের উগ্র আচরণের কারণেই এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সাবেক পৌর কাউন্সিলর দুলাল হোসেন ও বেশ কয়েকজন বহিরাগত সমিতি ভবনে এসেছিলেন। তবে কে বা কারা তাঁদের এখানে ডেকে এনেছিল, তা আমার জানা নেই।”

অন্যদিকে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সাবেক পৌর কাউন্সিলর দুলাল হোসেন নিজের দায় অস্বীকার করে বলেন, “পাথর ব্যবসার সামান্য এক লাখ টাকার লেনদেন নিয়ে বিরোধের জেরে এই সালিস চলছিল। বিবাদী পক্ষ আমার ঘনিষ্ঠজন এবং তিনি বাদীকে টাকা পরিশোধও করেছেন। সালিসের একপর্যায়ে আমি শৌচাগারে গিয়েছিলাম। বের হয়ে দেখি উভয়পক্ষ মারামারি করছে। আমি পরিস্থিতি দেখে সেখান থেকে চলে আসি। কী নিয়ে মারামারির সূত্রপাত, তা আমি জানি না।”

এদিকে, ঘটনার পর আদালত চত্বরে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করার একটি গুঞ্জন উঠলেও সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু হাসিব সাংবাদিক অবরুদ্ধ করার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। আইনজীবী সমিতি ভবনের ভেতরে এমন সহিংস হামলার ঘটনায় সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তার চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।