অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি! ‘মাই লর্ড, ইউর অনার’দের দাপট কমবে কী?

সিরাজ প্রামাণিক: ‘বিচার বিভাগ’ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, এমন সংবাদ নতুন কিছু নয়। প্রবাদে আছে, ‘আদালতের ইটও ঘুষ খায়’। এরই মধ্যে বিচার বিভাগীয় আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও বিলুপ্তি ঘোষণা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেক আইনজীবী বন্ধু এটা নিয়ে কিছু লিখতে আমাকে রীতিমতো বাধ্য করেছেন। তবে আজকের নিবন্ধটি একটু ব্যতিক্রম ও আবেগী।

আজ বুক ফেটে একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে। আমরা যারা প্রতিদিন সকালে কালো কোটটা গায়ে জড়াই, তারা শুধু একটা পেশা পালন করি না; আমরা লড়ি মানুষের অধিকারের জন্য। কিন্তু বুকভরা দুঃখ নিয়ে বলতে হয়, যে এজলাসে আমরা বিচারপ্রার্থীর হয়ে ন্যায়বিচার চাই, সেই এজলাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অনেক সময় আমাদের নিজেদেরই আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হয়। বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্তির সংবাদটি কেন সাধারণ আইনজীবী থেকে শুরু করে আমজনতার মনে একটু হলেও স্বস্তি দিচ্ছে? কেন অনেকে একে সাধুবাদ জানাচ্ছে?

উত্তরটা খুব সরল, কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিচারালয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে কিছু কিছু বিচারকের অতি অমানবিক ও খেয়ালখুশিমতো আচরণ আজ দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে।

আদালত কক্ষের একটি অলিখিত নিয়ম আছে, আইনজীবীরা বিচারককে ‘মাই লর্ড’ বা ‘ইয়োর অনার’ বলে সর্বোচ্চ সম্মান দেখাবেন। আমরা তা দেখাই, কারণ আমরা ওই চেয়ারটাকে সম্মান করি, আইনের শাসনকে সম্মান করি। কিন্তু বিনিময়ে আমরা কী পাই? তুচ্ছ কারণে আইনজীবীদের ধমক দেওয়া হচ্ছে, এজলাসে দাঁড়িয়ে অপমান করা হচ্ছে। কূটকৌশল আর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আইনজীবীদের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা করা হয়। একজন আইনজীবী যখন অপমানিত হন, তখন শুধু একজন ব্যক্তি অপমানিত হন না, বরং বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষটির আইনি লড়াইয়ের সাহসটাও ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

আরও পড়ুন : বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: সুপ্রিম কোর্ট সেক্রেটারিয়েট বাতিল—একটি পশ্চাৎমুখী সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণ

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মানে কি এই যে, একজন বিচারক এজলাসে বসে যা ইচ্ছে তাই করবেন? আইনজীবীদের সঙ্গে চাকর-বাকরের মতো আচরণ করবেন? কখনোই না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মানে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, কোনো ব্যক্তির খেয়ালখুশির রাজত্ব নয়। আর আদালতের পিওন, পেশকার, স্টাফদের কথা তো বাদই দিলাম। আমরা আইনজীবীরাও যে ধোয়া তুলসীপাতা, সেটাও কিন্তু নয়!

আজ যদি আলাদা সচিবালয়ের ক্ষমতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়, তবে তার দায় কার? যখন ক্ষমতার অপব্যবহার হয়, যখন আইনজীবীদের মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়, তখনই মানুষ বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হোক বা না হোক, এই সংবাদটি বিচারালয়ের ভেতরের একটি বড় ক্ষতকে সবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

আমরা বিচারকদের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে জড়াতে চাই না। আমরা চাই একটি সুস্থ, সুন্দর এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ। একজন জুনিয়র আইনজীবীও যেন এজলাসে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে কথা বলতে পারেন। কোনো বিচারক যেন তাঁর ব্যক্তিগত অহংকার বা মেজাজ আইনজীবীদের ওপর চাপিয়ে না দেন। আইনজীবীদের পেশাগত মর্যাদা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।

আইনজীবী এবং বিচারক, উভয়ই বিচার ব্যবস্থার দুটি প্রধান স্তম্ভ। একটি স্তম্ভকে ভেঙে বা অপমান করে অপরটি কোনোদিন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। আসুন, ক্ষমতার দাপট বাদ দিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটা ফিরিয়ে আনি। আদালত হোক সুশাসনের প্রতীক, অপমানের মঞ্চ নয়।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা, আইন গবেষক ও পিএইচডি ইন ল। ই-মেইল: seraj.pramanik@gmail.com