মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী : প্রায় ৮০ বছর বয়সী, বার্ধক্যে নুয়ে পড়া একজন পিতা। অসুস্থতা যাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। বৃদ্ধ বয়সে যেখানে তাঁর ঘরে বসে একটু বিশ্রাম নেওয়ার কথা, সেখানে কলিজার টুকরো ছেলের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের আশায় তিনি প্রতিনিয়ত লোহাগাড়া থেকে চট্টগ্রাম আদালতের বারান্দায় ছুটে আসেন। এটাই হয়তো সন্তানের প্রতি বাবার চিরন্তন নিয়তি!
সেই মানুষটি আর কেউ নন, আমার শহীদ বন্ধু আলিফের বাবা। সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা হলো, যেই আদালতে একসময় কর্মরত ছিল তাঁর স্বপ্নের আইনজীবী সন্তান, ঠিক সেই আদালতেই আজ চলছে তাঁর সন্তানের হত্যা মামলা!
বাড়ি থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এই বৃদ্ধ বয়সে আদালতের কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ানো তাঁর জন্য কতটা কষ্টের, তা কাছ থেকে না দেখলে কাউকে বোঝানো সম্ভব না। কোতোয়ালি মোড় পেরিয়ে আদালত চত্বরে উঠলেই যেন কেঁপে কেঁপে উঠতো তাঁর ক্ষতবিক্ষত হৃদয়, চোখ দিয়ে টলমল করে জল গড়িয়ে পড়ত। সেই দৃশ্য আমি বারবার দেখেছি। নিজের হৃদয়ে তীব্র রক্তক্ষরণ হলেও, আমি সর্বদা দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তাঁকে সাহস জুগিয়ে আদালতে নিয়ে এসেছি। বয়সের ভারে আজ তাঁর স্মৃতি দুর্বল, শরীর ভেঙে পড়েছে; কিন্তু বুকের ভেতর সন্তানের রক্তাক্ত স্মৃতি এখনো সমান জীবন্ত।
এই সেই কোর্ট বিল্ডিং, এই সেই আইনজীবীদের চেনা ভিড়… চারপাশে সবকিছুই আজ স্বাভাবিক। শুধু নেই তাঁর সেই উদীয়মান তরুণ সন্তান—অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম আলিফ। এই আদালত প্রাঙ্গণেই হাজার হাজার আইনজীবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেও সে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল। ছেলের বন্ধু হিসেবে এই দৃশ্যটা প্রতিমুহূর্তে আমার বুকে তীরের মতো বিঁধত, আর চোখের সামনে ভেসে উঠত সাইফুলের সাথে কাটানো অজস্র স্মৃতি।
আদালতের কাঠগড়ায় মনস্তাত্ত্বিক খেলা
অবশেষে মামলার বিচার শুরু হলো, এলো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব। তিনি একদিকে মামলার বাদী ও সংবাদদাতা, অন্যদিকে নিহত সন্তানের পিতা! কিন্তু মামলার বাদী হিসেবে যখন আঙ্কেলের আদালতে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার কথা, তিনি ভয়ে শিউরে উঠতেন। যে নৃশংসতায় তাঁর কলিজার টুকরোকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, সেই ভয়াবহতার বর্ণনা তিনি কীভাবে মুখে আনবেন? আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরা কীভাবে সামলাবেন? বারবার আমাকে বলতেন— “বাবা, আমি সাক্ষ্য দিতে পারব না! ছেলের কথা মনে পড়লে আমার সব এলোমেলো হয়ে যায়।”
কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে সবাইকে তাক লাগিয়ে সেদিন আদালতে আঙ্কেল চমৎকারভাবে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম। কিন্তু ঠিক তখনই শুরু হলো এক নির্মম মনস্তাত্ত্বিক খেলা, শুরু হলো আরেক নতুন যন্ত্রণা!
এক আসামির পক্ষে জেরা করার জন্য সময় প্রার্থনা করা হলো এবং আদালত তা মঞ্জুর করলেন। এরপর একে একে পাঁচবার—প্রতিটি ধার্য তারিখে এই বৃদ্ধ পিতা লোহাগাড়া থেকে তীব্র কষ্ট সহ্য করে আদালতে এসেছেন। কিন্তু প্রতিবারই সময়ের আবেদন আর তারিখ পরিবর্তনের কারণে আঙ্কেল চরম হতাশা, এক বুক মানসিক যন্ত্রণা আর ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতেন। বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে যেন তাঁর বিশ্বাসই উঠে যাচ্ছিল। আইন ও আদালতের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, একজন সন্তানহারা বৃদ্ধ পিতার সাথে এই ধারাবাহিক সময়ক্ষেপণ আমাদের কাছে চরম অমানবিক আর ন্যায়বিচারের পরিপন্থী মনে হয়েছে। আমরাও বিজ্ঞ আদালতে আমাদের সর্বোচ্চ জোরালো বক্তব্য আঙ্কেলের সামনেই তুলে ধরেছি।
“বাবা, আমি আর আসব না…”
নিহত আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম আলিফ ছিলেন চট্টগ্রাম বার ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্য। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর বিচার নিয়ে একজন বৃদ্ধ পিতার চোখে আমি ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের ক্ষয়ে যাওয়া আস্থা দেখেছি।
আজ ২০ মে, মামলার ধার্য তারিখ ছিল। গত পরশুদিন হঠাৎ আঙ্কেল আমাকে ফোন দিয়ে কেঁদে ফেললেন। বললেন, “বাবা, আমি আর আসব না মামলায় সাক্ষ্য দিতে। আমার সারা শরীর ব্যথা করছে, পা দুটো ফুলে গেছে। আমার যদি যাওয়ার খুব প্রয়োজন না হয়, তবে এখান থেকে রেহাই পাওয়া যায় কি না একটু জজ সাহেবকে বলো।”
ফোনের ওপাশ থেকে বৃদ্ধ বাবার এই আকুতি শুনে আমার কলিজাটা ফেটে যাচ্ছিল। অবুঝ শিশুকে যেভাবে মানুষ সান্ত্বনা দেয়, আমি আঙ্কেলকে সেভাবে বুঝিয়ে রাজি করালাম। সাহস দিয়ে বলেছিলাম, “আঙ্কেল, আর মাত্র একটা দিন। আজকে যদি আপনার সাক্ষ্য শেষ না হয়, তবে…!” ওনার মতো আমিও মামলার তারিখের আগে প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকি। সবকিছু নিজের ভিতরে চেপে রেখে বরাবরের মতো তাকেও বুঝিয়ে আদালতে নিয়ে এসেছি। এবারও আশ্বস্ত করেছিলাম— “আঙ্কেল, ইনশাআল্লাহ এবার আপনার কষ্টের শেষ হবে। আমরা কোনো ছাড় দিবো না।”
আজ সকালে তিনি যখন আমার চেম্বারে আসলেন, খেয়াল করলাম ওনাকে খুব ক্লান্ত লাগছিল। মুখটা মলিন, চোখে ঘুমহীন যন্ত্রণা। কিছুক্ষণ পাশে বসে কথা বলে ধীরে ধীরে তাঁকে এজলাসে নিয়ে গেলাম। বরাবরের মতো আজও নতুন ইস্যুতে সেই আসামিপক্ষের এক আইনজীবী অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সময় প্রার্থনা করেন। আমরা সেই আবেদনের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ জোরালো আইনি বক্তব্য উপস্থাপন করি। অবশেষে আদালত যথার্থ বিবেচনায় আসামিপক্ষের সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করে পিডব্লিউ-১ (PW-1) হিসেবে আঙ্কেলের সাক্ষ্য সমাপ্ত ঘোষণা করেন। আদেশ ঘোষণার পর আঙ্কেলের চোখেমুখে আমি এক মহাসস্তির মুক্তি দেখেছি। মনে হচ্ছিল, যেন এক দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে মুক্ত হলেন তিনি।
এটি শুধু মামলা নয়, বন্ধুর রক্তের ঋণ
প্রকাশ্য ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার শহীদ অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম আলিফের হত্যা মামলায় আজ তাঁর পিতার সাক্ষ্য সমাপ্ত হয়েছে। একজন আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনা করা আমাদের পেশাগত দায়িত্ব। কিন্তু এই মামলাটি আমার কাছে শুধু একটি আইনি ফাইল নয়—এটি প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে খুন হওয়া আমার শহীদ আইনজীবী বন্ধুর রক্তের বিচার। এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের গোটা আইন পেশাই কলঙ্কিত হবে। সেই জায়গা থেকে মামলার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি শুনানি, প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে একেকটি মানসিক যুদ্ধ।
আঙ্কেল আমার জন্য অনেক দোয়া করেন। আর একজন বিশ্বাসী হিসেবে আমার মনে একটি প্রগাঢ় বিশ্বাস আছে—কিয়ামতের ময়দানে আমি আমার শহীদ বন্ধুর সুপারিশ পাবো। সেদিন আমি তাকে বুক ফুলিয়ে বলতে পারবো— “বন্ধু, তোর রক্তের বিচারের জন্য আমি আমার সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে লড়েছি।”
আলিফ হত্যার বিচার নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলে, “বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে”—আইনজীবী হিসেবে আমি এই হতাশাজনক কথাটি বিশ্বাস করতে চাই না। আমরা আমাদের মেধা, বিদ্যা আর জ্ঞান দিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাব। মানুষ হিসেবে আমরা চেষ্টা করি, আইনজীবী হিসেবে লড়াই করি; তবে একজন মুসলিম হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—চূড়ান্ত ফয়সালা জমিনে নয়, আসমানে হয়!
ইনশাআল্লাহ, দেশ-বিদেশে আলোচিত এই স্পর্শকাতর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মামলাটির দ্রুত ও সুচারু বিচারসম্মত নিষ্পত্তি হবে। আর একজন বৃদ্ধ পিতার চোখের পানি কখনো বৃথা যাবে না।
বন্ধু সাইফুল, তোর বাবার চোখের জল আমরা কোনোভাবেই বৃথা যেতে দেব না!
লেখক : মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী; মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এবং সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর।




