কক্সবাজারে সেনা কর্মকর্তা তানজিম হত্যায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
নিহত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট মো. তানজিম ছারোয়ার নির্জন

সেনা কর্মকর্তা তানজিম হত্যা মামলা: ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৯ জনের যাবজ্জীবন; দ্রুততম সময়ে রায় ঘোষণা

মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী, কক্সবাজার | কক্সবাজারের চকরিয়ায় ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযানে গিয়ে নির্মমভাবে নিহত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর মাত্র ১ বছর ৭ মাস ২৬ দিনের মধ্যে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ৪ জন ডাকাতকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। একই সাথে অস্ত্র আইনের অপর একটি মামলাতেও এই ১৩ আসামির প্রত্যেককে পৃথক মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আজ বুধবার (২০ মে) কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পঞ্চম আদালত এবং স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী ফৌজদারি দণ্ডবিধি ও অস্ত্র আইনের পৃথক দুটি মামলায় এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় কারাগারে থাকা ১১ আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন, তবে দণ্ডপ্রাপ্ত ২ আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন।

মামলার সংক্ষিপ্ত পটভূমি ও হত্যাকাণ্ড

২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত দেড়টার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া এলাকায় সশস্ত্র ডাকাত দলের হানা দেওয়ার খবর পেয়ে অভিযানে যায় সেনাবাহিনীর একটি দল। অভিযানে গিয়ে ডাকাতদের প্রতিরোধ করার সময় তরুণ সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন (২৩) নির্মমভাবে ছুরিকাঘাতের শিকার হন এবং দেশের জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেন।

এই ঘটনার পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে ১৭ জনের বিরুদ্ধে চকরিয়া থানায় ডাকাতির প্রস্তুতি ও হত্যার অভিযোগে একটি মামলা (এসটি মামলা নম্বর: ৩১৩/২০২৫) দায়ের করেন। একই ঘটনায় উদ্ধারকৃত আলামতের ভিত্তিতে চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা (এসপিটি মামলা নম্বর: ৫২/২০২৫) দায়ের করেন।

হত্যা মামলার রায়: ৪ জনের ফাঁসি, ৯ জনের যাবজ্জীবন

চকরিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) অরূপ কুমার চৌধুরী তদন্ত শেষে ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা, আলামত পর্যালোচনা ও যুক্তিতর্ক শেষে আদালত আজ ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৯৯ ধারায় ৪ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ আসামি হলেন: ১. হেলাল উদ্দিন (পিতা: জাফর আলম) ২. নুরুল আমিন প্রকাশ আমিন (পিতা: মৃত কামাল হোসেন) ৩. নাছির উদ্দিন (পিতা: আবদুল মালেক) ৪. মোর্শেদ আলম (পিতা: আবুল কালাম) — [পলাতক]

এছাড়াও আদালত দণ্ডবিধির ৩৯৯/৪০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ৯ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৯ আসামি হলেন: জালাল উদ্দীন প্রকাশ বাবুল, মোহাম্মদ আরীফ উল্লাহ, মো: আনোয়ার হাকিম, মো: জিয়াবুল করিম, মো: ইসমাইল হোসেন প্রকাশ হোসেন, এনামুল হক প্রকাশ তোতা এনাম, মোহাম্মদ এনাম, মো: কামাল প্রকাশ বিন্ডি কামাল এবং আবদুল করিম প্রকাশ মো: মোহাম্মদ করিম [পলাতক]। দণ্ডপ্রাপ্ত এই সকল আসামির বাড়িই চকরিয়া উপজেলায়।

অস্ত্র মামলার রায়: ১৩ আসামির পৃথক কারাদণ্ড

একই দিনে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী অস্ত্র মামলার রায়ও ঘোষণা করেন। রায়ে হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত উপরোক্ত ১৩ আসামির প্রত্যেককে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯(এ) ধারায় ১০ বছর এবং ১৯(এফ) ধারায় ৭ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। উভয় সাজা পরপর কার্যকর হবে বলে আদালত উল্লেখ করেন।

৫ জনের খালাস ও আইনজীবীদের বক্তব্য

উভয় মামলার চার্জশিটভুক্ত অপর ৫ আসামি যথাক্রমে—মোহাম্মদ ছাদেক, আনোয়ারুল ইসলাম, শাহ আলম, আবু হানিফ এবং মিনহাজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাঁদেরকে বেকসুর খালাস প্রদান করেছেন। কক্সবাজার জেলা জজ আদালতের জেলা নাজির বেদারুল আলম রায়ের এই তথ্যসমূহ নিশ্চিত করেছেন।

আদালতে বাদী পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর এবং রাষ্ট্র পক্ষে অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম চৌধুরী মামলাটি পরিচালনা করেন। রায় ঘোষণার পর নিহত বীর সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিমের পরিবার চকরিয়া ও কক্সবাজার আদালতের এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, শহীদ সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জনের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। তিনি ৮২তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে ২০২২ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (BMA) থেকে আর্মি সার্ভিস কোরে (ASC) কমিশন লাভ করেছিলেন। মাত্র ১ বছর ৭ মাসের মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় প্রদান দেশের বিচার বিভাগের দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।