নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিকের বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট বিক্রির নামে সাড়ে ৭৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় দুই বছরের সশরীরে কারাদণ্ড (বিনাশ্রম) প্রদান করেছেন আদালত।
আজ বুধবার (২০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জামসেদ আলম বহুল আলোচিত এই প্রতারণা মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে দুই বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি বিদিশাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে তাকে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে আদালত তাঁর আদেশে উল্লেখ করেছেন।
বাদীপক্ষের আইনিজীবী অ্যাডভোকেট হেমায়েত উদ্দিন হিরণ রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, মামলার রায় ঘোষণার সময় আসামি বিদিশা সিদ্দিক আদালতে উপস্থিত না থাকায় (পলাতক) বিজ্ঞ বিচারক তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ (Conviction Warrant) নতুন করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছেন।
তবে রায়ের পর গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে বিদিশা সিদ্দিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে সাংবাদিকদের জানান, এই মামলার আইনি প্রক্রিয়া বা আজকের রায়ের বিষয়ে তিনি আগে থেকে কিছুই অবগত ছিলেন না।
মামলার বিবরণ: ফ্ল্যাট বিক্রির নামে অর্থ আত্মসাৎ
আদালতের নথি ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মামলার বাদী মোশাররফ হোসেন রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকার একজন প্রতিষ্ঠিত স্যানিটারি পণ্য আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী। ২০০১ সালে গুলশান ও বারিধারা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট কেনার উদ্দেশ্যে তিনি বিদিশার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরবর্তীতে বারিধারা কূটনৈতিক এলাকার বিখ্যাত ‘প্রেসিডেন্ট পার্ক’-এর একটি ফ্ল্যাট বিক্রির উদ্দেশ্যে উভয়পক্ষের মধ্যে ৮০ লাখ টাকার একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০০১ সালের ১০ জুলাই বিদিশা সিদ্দিক বাদী মোশাররফ হোসেনকে বনানীর রজনীগন্ধা অফিসে ডেকে নেন এবং তাঁর মনোনীত ঘনিষ্ঠ বন্ধু আব্দুল রাজ্জাকের নামে ৭৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার দিতে বলেন। বাদী সরল বিশ্বাসে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখার মাধ্যমে ওই বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করেন এবং পরবর্তীতে উভয়ের মধ্যে একটি আইনি বায়নানামা (Deed of Agreement) সম্পাদিত হয়।
নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট না দিয়ে সময়ক্ষেপণ
চুক্তির শর্তানুযায়ী, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে বাকি ৫ লাখ টাকা পরিশোধ সাপেক্ষে ২০০২ সালের ১০ জুলাইয়ের মধ্যে ফ্ল্যাটটি সম্পূর্ণ রেজিস্ট্রি করে বাদীকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও বিদিশা ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে ব্যর্থ হন।
পরবর্তীতে ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন টাকা ফেরত কিংবা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য ক্রমাগত চাপ দিলে বিদিশা টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি বাদীকে ৭২ লাখ টাকার একটি চেক প্রদান করেন। তবে নির্ধারিত সময়ে বাদী চেকটি ভাঙাতে ব্যাংকে জমা দিলে বিদিশার অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় চেকটি ‘ডিজঅনার’ (Disonour) হয়।
‘এরশাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের’ অজুহাত ও হুমকি
মামলার অভিযোগে বাদী আরও দাবি করেন, এরপর টাকা ফেরত চাইলে বিদিশা বিভিন্ন অজুহাতে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে টাকা বা ফ্ল্যাটের দাবি জানালে বিদিশা ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে বাদীকে প্রাণনাশের হুমকিও প্রদান করেন।
এমনকি বিদিশা বাদীকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছ থেকে তাঁর পাওনা টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত বাদী মোশাররফ হোসেনকে অপেক্ষা করতে হবে। দীর্ঘ সময় কোনো প্রতিকার না পেয়ে অবশেষে ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী গুলশান থানায় দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় এই জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলাটি দায়ের করেন। দীর্ঘ ১৮ বছর আইনি লড়াই ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আজ আদালত এই রায় প্রদান করলেন।

