ধ'র্ষ'ণ মামলার বিচার ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব কি না?
মাসুদুর রহমান

বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: সুপ্রিম কোর্ট সেক্রেটারিয়েট বাতিল—একটি পশ্চাৎমুখী সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণ

মাসুদুর রহমান : বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করবে। কিন্তু এই সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথ কখনোই সহজ ছিল না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, যা প্রশাসনিক, আর্থিক এবং কার্যকরী স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে বিচার বিভাগের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো, বিশেষ করে একটি স্বতন্ত্র সুপ্রিম কোর্ট সেক্রেটারিয়েট গঠন করা ছিল সময়ের দাবি এবং বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য অপরিহার্য পদক্ষেপ।

২০০৭ সালে আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক Secretary, Ministry of Finance vs Masdar Hossain (52 DLR (AD) 82) মামলার রায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এই রায়ে আপিল বিভাগ ১২ দফা নির্দেশনা প্রদান করে, যার মধ্যে অন্যতম ছিল বিচার বিভাগের জন্য পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো গঠন, বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাহী হস্তক্ষেপ কমানো এবং আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এই নির্দেশনার আলোকে ম্যাজিস্ট্রেসি পৃথকীকরণসহ কিছু সংস্কার বাস্তবায়িত হলেও, একটি পূর্ণাঙ্গ বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা দীর্ঘদিন ধরেই অপূর্ণ থেকে যায়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সেক্রেটারিয়েট গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, যা বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে বর্তমান সরকার সেই সুপ্রিম কোর্ট সেক্রেটারিয়েট সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল এবং সুপ্রিম কোর্ট সেক্রেটারিয়েট বিলুপ্ত করে একটি গুরুতর ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার চলমান প্রক্রিয়াকে স্পষ্টভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। কারণ, একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ কেবল রায় প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাধীন হলেই যথেষ্ট নয়; বরং তার প্রশাসনিক কার্যক্রম, জনবল নিয়োগ, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নেও স্বাধীনতা থাকা আবশ্যক। সুপ্রিম কোর্ট সেক্রেটারিয়েট সেই স্বাধীনতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারত। সেটি বাতিল করা মানে বিচার বিভাগকে পুনরায় নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা—যা সংবিধানের মূল চেতনাবিরোধী।

আরও পড়ুন : সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম বন্ধ; সব বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করল সরকার

এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বর্তমান সরকার কার্যত বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যদি সত্যিই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আন্তরিকতা থাকত, তবে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ বাতিল করা হতো না। বরং এটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা হতো। বাস্তবতা হলো, বিচারকদের পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এখনও নির্বাহী প্রভাবের অভিযোগ বিদ্যমান। সুপ্রিম কোর্ট সেক্রেটারিয়েট বাতিলের ফলে এই প্রভাব আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ফলে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ অপরিহার্য। কিন্তু যখন বিচার বিভাগ প্রশাসনিকভাবে নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন বিচারিক স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। এতে জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, যা এই সমস্যার গভীরতা নির্দেশ করে। সুপ্রিম কোর্ট সেক্রেটারিয়েট বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অতএব, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, সুপ্রিম কোর্ট সেক্রেটারিয়েট বাতিল একটি ভুল, অযৌক্তিক এবং পশ্চাৎমুখী সিদ্ধান্ত, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গৃহীত সংস্কারগুলো পুনরায় কার্যকর করতে হবে এবং একটি শক্তিশালী, স্বতন্ত্র বিচার বিভাগীয় প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি অলঙ্কারিক বাক্যে পরিণত হবে, যার বাস্তব প্রতিফলন থাকবে না, এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

লেখক: মাসুদুর রহমান; অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। E-Mail: masud.law22@gmail.com