আদালত প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম | আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত আইনজীবীদের তীব্র প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। ২১টি পদের সবকটিতেই পূর্ণ প্যানেলে বিজয়ী হয়েছেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের প্রার্থীরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনের মিলনায়তনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর নানা নাটকীয়তা ও আইনি লড়াই শেষে রাত ১০টার দিকে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেন মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা রৌশন আরা বেগম।
নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের প্যানেল থেকে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাডভোকেট তারিক আহমদ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে জয়ী হয়েছেন অ্যাডভোকেট মো. মঈনুদ্দীন।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৯ পদে জয়
মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা রৌশন আরা বেগম জানান, ২১টি পদের মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ৯টি পদে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি ১টি সহ-সভাপতি ও ১১টি সদস্য পদে সরাসরি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামীর প্যানেল থেকে এসব পদে যাঁরা প্রার্থী ছিলেন, তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় ব্যালটে তাঁদের নাম ছিল। নির্বাচনে মোট ২ হাজার ১৬০ জন সদস্য তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত অন্যান্যরা হলেন:
-
জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি: সেলিমা খানম
-
সহ-সাধারণ সম্পাদক: মো. নজরুল ইসলাম
-
অর্থ সম্পাদক: আবুল মনছুর সিকদার
-
পাঠাগার সম্পাদক: তৌহিদ হোছাইন সিকদার
-
সাংস্কৃতিক সম্পাদক: বিলকিস আরা মিতু
-
ক্রীড়া সম্পাদক: মো. সরোয়ার হোসাইন
-
তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক: মো. লোকমান শাহ
ভোটের পদের ফলাফল
ভোট হওয়া সহ-সভাপতি পদে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নিলুফার ইয়াসমিন লাভলী ১,৭৬৩ ভোট পেয়ে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদের প্রার্থী মো. নেজাম উদ্দিন পেয়েছেন মাত্র ২৪০ vote।
এছাড়া সমিতির বাকি ১১টি সদস্য পদেও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের প্রার্থীরা একচেটিয়া জয় পেয়েছেন। বিজয়ী সদস্যরা হলেন— আলী আকবর, দিদারুল আলম, দিলদার আহমদ ভুঁইয়া, মো. ইকবাল হোসেন, মো. জসিম উদ্দিন, মোহাম্মদ হাসান, মোক্তার উদ্দিন, মোমিনুল হক, সাদিয়া খান, সাইফুল ইসলাম ও শেখ মোহাম্মদ ফয়সাল উদ্দিন।
বর্জন ও বিক্ষোভ: আদালত পাড়ায় চরম উত্তেজনা
এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম আদালত ভবন এলাকায় দফায় দফায় উত্তেজনা ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
১. জামায়াতপন্থি ‘ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদ’-এর অবস্থান
বাছাই প্রক্রিয়ায় ৯টি পদে জামায়াতপন্থি প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা এবং সময়মতো চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না করার অভিযোগ তুলে গত ৭ মে-ই নির্বাচন কমিশনকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল জামায়াত সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ আইনজীবী পরিষদ।
এমনকি নির্বাচন স্থগিত চেয়ে জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের করা একটি আবেদন আদালত নামঞ্জুর করার পর, গত বুধবার সমিতির বিদায়ী কমিটি থেকে জামায়াত সমর্থিত ৭ জন আইনজীবী একযোগে পদত্যাগ করেন। বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ চলাকালেও আদালত ভবনের সোনালী ব্যাংক চত্বরে এই ‘একতরফা’ নির্বাচনের প্রতিবাদে জোরালো সমাবেশ করেন তারা।
২. আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীদের অভিযোগ
আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীদের অভিযোগ ছিল, মনোনয়নপত্র সংগ্রহের মূল দিনে সমিতির লাইব্রেরির প্রধান ফটক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বন্ধ রেখে তাঁদের ফরম নিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে বুধবার চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে বিশাল মিছিল করেন তাঁরা এবং বৃহস্পতিবার ভোট চলাকালীন আইনজীবী সমিতি ভবনের নিচে অবস্থান নিয়ে একতরফা ও প্রহসনের ভোটের তীব্র নিন্দা জানান।
এর আগে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের জন্য গঠিত নির্বাচন কমিশন বাতিল ও নতুন তফসিল ঘোষণার দাবিতে জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীদের আবেদনে একটি তলবি সভা ডাকা হলেও, সেখানে কণ্ঠভোটে তাদের প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়।
তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ, আইনি জটিলতা এবং প্রধান দুটি প্যানেলের অনুপস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম বারের এই নির্বাচনটি আইনজীবী পাড়ায় আগামী বেশ কিছুদিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ আইনবিদরা।

