নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | তৃণমূল পর্যায়ে তথা গ্রামীণ জনপদে নামমাত্র খরচে ও স্বল্প সময়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আইনি সেবা পৌঁছে দিতে ‘গ্রাম আদালত’ অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। চুরি, দাঙ্গা, পারিবারিক বিরোধ ও প্রতারণাসহ অনধিক ৩ লাখ টাকা মূল্যমানের ছোটখাটো দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ নিষ্পত্তিতে গ্রাম আদালতকে আরও সক্রিয় ও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় জেলা তথ্য কর্মকর্তাদের নিয়ে এক বিশেষ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (২০ মে) ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে ‘বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (৩য় পর্যায়) প্রকল্প’-এর উদ্যোগে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুল জলিলের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও জাতীয় প্রকল্প পরিচালক সুরাইয়া আক্তার জাহান।
সভায় স্থানীয় সরকার ও আইনি বিশেষজ্ঞরা গ্রাম আদালতের এক্তিয়ার ও এর কাঠামোগত সুবিধার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে আইনি জটিলতা ও মামলার জট কমাতে গ্রাম আদালতের কোনো বিকল্প নেই।
-
আর্থিক এক্তিয়ার: গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ (সংশোধিত) অনুযায়ী এই আদালত সর্বোচ্চ ৩,০০,০০০ টাকা (তিন লাখ টাকা) মূল্যমানের ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারে।
-
আইনজীবী বর্জন: গ্রাম আদালতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে কোনো পক্ষই নিজেদের পক্ষে লড়তে আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না। এর ফলে আইনি মারপ্যাঁচ ও দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াই সাধারণ মানুষ সরাসরি নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ পান।
-
বিরোধের স্থায়ী সমাধান: এখানে সম্পূর্ণ সমঝোতার ভিত্তিতে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। ফলে এক বিরোধ থেকে পরবর্তীতে নতুন কোনো সামাজিক বা পারিবারিক শত্রুতা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে না। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী, প্রতিবন্ধী এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ অতি সহজে এর সুফল পেয়ে থাকেন।
আর্থিক ও মানসিক হয়রানি থেকে রক্ষার উপায়
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় প্রকল্প পরিচালক সুরাইয়া আক্তার জাহান বলেন, “গ্রামের সাধারণ ও নিরীহ মানুষকে যদি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গ্রাম আদালতের মাধ্যমে আইনি সেবা দেওয়া যায়, তবে তারা দেশের প্রচলিত উচ্চ আদালতের বিপুল অর্থ ও দীর্ঘদিনের মানসিক হয়রানি থেকে রক্ষা পাবে। সাধারণ চুরি, দাঙ্গা, প্রতারণা, ঝগড়া-বিবাদ, হুমকি দেওয়া, নারীর অমর্যাদা, বাল্যবিয়ে বা তালাকের মতো বিষয়গুলোর সুরাহা এই গ্রাম আদালত থেকেই পাওয়া সম্ভব।”
তিনি তৃণমূলের সাধারণ মানুষকে এই আদালতের আইনি এক্তিয়ার সম্পর্কে সচেতন করতে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের ভূমিকা ও সমন্বয়
সভাপতির বক্তব্যে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুল জলিল বলেন, দেশের প্রান্তিক মানুষকে তাঁদের অধিকার এবং সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে সচেতন ও হালনাগাদ রাখতে জেলা তথ্য কর্মকর্তাগণ নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। গ্রাম আদালতকে কার্যকর করতে তথ্য অফিসের সাথে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত প্রচার কার্যক্রম আরও জোরদার করা হলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।
সভায় প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে একটি তথ্যবহুল পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন প্রকল্প সমন্বয়ক বিভাস চক্রবর্তী। এছাড়া ‘গ্রাম আদালত আইন ২০০৬’ এবং এর বিভিন্ন আইনি বিধিবিধান নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞ আইনজীবী ব্যারিস্টার মশিউর রাহমান চৌধুরী এবং অধিদপ্তরের কাজের ক্ষেত্রগুলো নিয়ে আলোকপাত করেন গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের পরিচালক ডালিয়া ইয়াসমিন।

