সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলোপের পর জুডিসিয়াল সার্ভিসের ১৫ কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় আদালত পাড়ায় তৈরি হওয়া চরম আইনি ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই এবার নতুন মোড় এল। সুপ্রিম কোর্টের অধীনে স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া সেই ঐতিহাসিক রায়ের বিরুদ্ধে অবশেষে আপিল দায়ের করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে এই লিভ টু আপিলটি দায়ের করা হয়। দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তা তথা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়েরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।

মূল রায় ও ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল

আইনি তথ্যসূত্রে জানা যায়, সুপ্রিম কোর্টের সাতজন প্রথিতযশা আইনজীবীর জনস্বার্থে দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। বিচারপতি আহমেদ সোহেল এবং বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত তৎকালীন হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায়টি প্রদান করেছিলেন।

হাইকোর্টের ওই রায়ে বর্তমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে মূল সংবিধানের মৌল কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক, বেআইনি ও বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। একই সাথে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে পুনর্বহাল করার ঐতিহাসিক আদেশ দেওয়া হয়। তৎকালীন মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের একক ও পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত ছিল, যা পরবর্তী সংশোধনীতে আইন মন্ত্রণালয়ের যৌথ এখতিয়ার বা ‘দ্বৈতশাসনে’ রূপ নেয়। হাইকোর্ট বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে রায় দেওয়ার তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠা করার জন্য সরকারকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

অধ্যাদেশ জারি থেকে বর্তমান বিলোপের প্রেক্ষাপট

হাইকোর্টের ওই ঐতিহাসিক রায়ের পর পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে কার্যকরভাবে পৃথকীকরণের লক্ষ্যে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে এবং সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয়ের কাঠামো দাঁড় করায়।

তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার অধ্যাদেশটি আর সংসদে পাস না করে তা রহিতকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ মে (মঙ্গলবার) আইন মন্ত্রণালয়ের এক জরুরি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নবগঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। একই সাথে সেখানে প্রেষণে কর্মরত সিনিয়র সচিবসহ জুডিসিয়াল সার্ভিসের মোট ১৫ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত বা সংযুক্ত করা হয়।

আইনি লড়াই এখন আপিল বিভাগে

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বন্ধ এবং বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার সরকারি পদক্ষেপকে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা ‘মারাত্মক আদালত অবমাননা’ বলে অভিহিত করে আজই সুপ্রিম কোর্টে কনটেম্পট পিটিশন দায়েরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আইনজীবীদের একাংশ যখন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন, ঠিক তখনই আজ সুপ্রিম কোর্ট খোলার দিনে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের মূল রায়ের আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আপিল বিভাগে আবেদন দাখিল করল।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাষ্ট্রপক্ষের এই আপিল দায়েরের ফলে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের দীর্ঘ আইনি লড়াইটি এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা আপিল বিভাগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করছে। আগামী দিনগুলোতে আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চে এই বিষয়ে এক ম্যারাথন ও ঐতিহাসিক শুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।