বিশেষ প্রতিবেদক | জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য আর্থিক বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানো হলেও তা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন আইন সংশ্লিষ্টরা। নতুন বাজেটে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য ২ হাজার ১২৮ কোটি টাকা এবং সুপ্রিম কোর্টের জন্য ২৯১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেট বৃদ্ধির এই হারকে সংশ্লিষ্টরা ইতিবাচকভাবে দেখলেও তাদের মতে, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনের জন্য তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। তাদের দাবি, সরকার পরিবর্তন হলেও বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ বারবার অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে।
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবার আইন ও বিচার বিভাগের জন্য ২ হাজার ১২৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের জন্য বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ২৯১ কোটি টাকা।
বিগত কয়েক বছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইন ও বিচার বিভাগের সংশোধিত বাজেট ছিল ২ হাজার ৫৯ কোটি টাকা এবং সুপ্রিম কোর্টের জন্য ২৭০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ২২ কোটি টাকা এবং সুপ্রিম কোর্টের জন্য ২৪৮ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আইন ও বিচার বিভাগের সংশোধিত বাজেট ছিল ১ হাজার ৭১৭ কোটি টাকার কিছু বেশি, যেখানে মূল বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা। সেই তুলনায় এবার বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও মাঠপর্যায়ের বিচারিক সংকট দূর করতে তা সামান্যই ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।
আরও পড়ুন : শিশু রামিসা হত্যা: ফাঁসির ২ আসামির জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করলেন হাইকোর্ট
বিচার বিভাগের সীমাবদ্ধতা ও বাজেট প্রসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, ‘এবারের বাজেটে ভবিষ্যতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, আদালতের পৃথক ভবন নির্মাণ ও বার ভবন তৈরির মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা থাকলে ভালো হতো। সারাদেশে মামলার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা বাড়াতে হবে, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবল ও অবকাঠামোও বৃদ্ধি করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমি এই বাজেটকে অপ্রতুল বলবো না। তবে আলোচনার মাধ্যমে বরাদ্দ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট এবং সরকারেরও উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’
বদরুদ্দোজা বাদল আরও বলেন, ‘জজসহ আদালতে কর্মরতদের বেতন-ভাতা পর্যাপ্ত নয়। বর্তমান কাঠামোর তুলনায় তা দ্বিগুণ হওয়া দরকার। সম্পূরক বাজেটের সুযোগ রয়েছে, সেখানে বিচার বিভাগের জন্য আরও বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।’
সুপ্রিম কোর্টের আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মামুন মাহবুব বাজেট বরাদ্দের এই অবহেলাকে রাজনৈতিক মানসিকতার সংকট হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করুক—এটা কোনও সরকারই প্রকৃত অর্থে চায় না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু সরকারে থাকলে বিষয়টি অনেকে উপলব্ধি করে না, বিরোধী দলে গেলে করে।’
আরও পড়ুন : এক দিনেই হাইকোর্টে ৬,১৯৯টি পুরোনো মামলা নিষ্পত্তি: ৩ দিনে নিষ্পত্তি ১৩,২৮৮ মামলা
তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত ঘাটতি এখনও প্রকট। জেলা জজদের বাসভবন ও গাড়ির সুবিধা থাকলেও অনেক বিচারকের নিজস্ব আবাসনের ব্যবস্থা নেই। অনেককে গণপরিবহনে করে আদালতে যাতায়াত করতে হয়। অথচ নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের জন্য এসব সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।’
মামুন মাহবুবের ভাষ্য, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিটি জেলায় জাজেস কমপ্লেক্স নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু তা বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, অনেক জায়গায় এখনও উপযুক্ত আদালত ভবনও গড়ে ওঠেনি। বিচার বিভাগকে দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত রাখা হয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগ আমলে যে অবস্থায় ছিল, ড. ইউনূস সরকারের সময় তা আরও খারাপ হয়েছে এবং বর্তমান সরকারের আমলেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। অনেকের মধ্যে এমন ধারণা কাজ করে যে, বিচার বিভাগের জন্য কার্যকর বরাদ্দ ও কাঠামোগত স্বাধীনতা নিশ্চিত হলে তারা আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। ফলে এ খাতটি যথাযথ গুরুত্ব পায় না।’
সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘জনগণ তাদের অধিকার আদায়ে বারবার আন্দোলন করেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিচার বিভাগের জন্য কার্যকর ও বাস্তবমুখী বাজেট নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।’

