কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | দেশের বিচারপ্রার্থী জনগণের দ্রুত ও নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিচারকদের সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারির সঙ্গে বিচারিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের এজলাস, রেকর্ডরুম ও আবাসন-সংকট নিরসনে দ্রুত দৃশ্যমান পরিকাঠামো উন্নয়নের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
গতকাল শনিবার (২০ জুন) সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে ঢাকা বিভাগে কর্মরত বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সকল স্তরের বিচার বিভাগীয় সদস্যদের উদ্দেশ্যে এক বিশেষ অভিভাষণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বর্তমান সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। ঢাকা বিভাগের সকল জেলা থেকে আসা জেলা ও দায়রা জজ, মহানগর দায়রা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটগণ এই গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।
বিচারকদের আর্থিক স্বাধীনতা ও অবকাঠামোগত সংকট দূর করার দাবি
অভিভাষণ অনুষ্ঠানে মাঠপর্যায়ের শীর্ষ বিচারিক কর্মকর্তারা স্ব-স্ব আদালতের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বক্তব্য প্রদান করেন। তারা দেশের বিচার ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও গতিশীল করতে বেশ কিছু মৌলিক ও জরুরি দাবি তুলে ধরেন, যার মধ্যে অন্যতম:
-
বিচারকদের প্রকৃত আর্থিক স্বাধীনতা ও সক্ষমতা নিশ্চিতকরণ।
-
জাতীয় বাজেটে সামগ্রিকভাবে বিচার বিভাগের জন্য বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা।
-
জরুরি ভিত্তিতে জেলা আদালতগুলোতে বিদ্যমান এজলাস (কোর্ট রুম), বিচারকদের খাসকামরা, রেকর্ডরুম, মালখানা ও আবাসন-সংকট নিরসনে টেকসই অবকাঠামোগত সংস্কার ও নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ।
-
আদালত প্রাঙ্গণ এবং বিচারকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।
-
আদালতের সামগ্রিক বিচার প্রক্রিয়া ডিজিটাইজেশন করা এবং বিচারকাজে প্রয়োজনীয় আধুনিক লজিস্টিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান।
কর্মকর্তাদের দাবির সাথে একমত আইনমন্ত্রী
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিচারিক কর্মকর্তাদের উত্থাপিত প্রতিটি যৌক্তিক সংকটের বিষয়ের সাথে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে আশ্বস্ত করে বলেন, বর্তমান সরকার বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।
আইনমন্ত্রী বিচার বিভাগের সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিচারকদের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং বিচারিক কাজের পরিবেশ উন্নত করার লক্ষ্যে আগামীতে বিচার বিভাগের জন্য রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন এবং এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রতিটি জেলা আদালতে মেডিকেল ও ডে-কেয়ার সেন্টার হবে: প্রধান বিচারপতি
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী তাঁর দীর্ঘ অভিভাষণে জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের প্রতিটি বক্তব্যের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। তিনি দেশের বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়নে নিজের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, বিচার বিভাগের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিকাঠামোর উন্নয়ন, ডিজিটাইজেশন ও বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কাজ চলছে।
তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, বিচারকদের আধুনিক আইনি প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ করতে দেশি-বিদেশি উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রতিটি জেলা আদালত প্রাঙ্গণে জরুরি মেডিকেল সেন্টার ও নারী বিচারক-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন, রায় লেখার গতি বাড়াতে ‘স্পিচ-টু-টেক্সট’ (Speech-to-Text) বাংলা সফটওয়্যার তৈরি ও ব্যবহার এবং বিচারকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে তিনি ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছেন।
পরিশেষে, প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের বিদ্যমান বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতাকে মেধা ও একাগ্রতা দিয়ে অতিক্রম করে, আদালতে আসা সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে সব স্তরের বিচারকদের সর্বোচ্চ সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানান।

