নিউমার্কেটে আইনজীবীর চেম্বারে আগুন, দগ্ধ হয়ে দুজনের মৃত্যু

প্রসিকিউটরের ল চেম্বার পুড়ে ছাই, দুই ক্লার্কের মর্মান্তিক মৃত্যু, নাশকতার অভিযোগ

কাঁটাবনে বহুতল ভবনে আগুন

কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | রাজধানীর কাঁটাবন ও এলিফ্যান্ট রোড সংলগ্ন আল বারাকা টাওয়ারের ১২ তলায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আল নোমানের ব্যক্তিগত ল চেম্বারসহ মূল্যবান বই ও নথিপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় চেম্বারে থাকা দুই ক্লার্ক (দাপ্তরিক সহকারী) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ও শ্বাসরোধে মারা গেছেন।

অগ্নিকাণ্ডের সময়কার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ রহস্যজনকভাবে গায়েব থাকার কথা উল্লেখ করে কোনো কারণে তাঁর চেম্বারে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রসিকিউটর নোমান।

গতকাল শুক্রবার (২৬ জুন) দিবাগত রাতে রাজধানীর নিউমার্কেট থানাধীন এলিফ্যান্ট রোড ও কাঁটাবন এলাকার ১৪ তলাবিশিষ্ট আল বারাকা টাওয়ারে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আজ শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আল নোমান তাঁর চেম্বার পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া এবং দুই কর্মীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, ভবনটির ১২ তলায় মোট চারটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে তিনটিতে বিভিন্ন আইনজীবীর চেম্বার এবং একটিতে আবাসিক বাসা। ১২ তলার ‘ডি-১’ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টের চেম্বারটি মূলত সাবেক উপদেষ্টা হাসান আরিফের ছিল। তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর ছেলে ব্যারিস্টার মোয়াজ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আল নোমান যৌথভাবে চেম্বারটি ব্যবহার করছিলেন। অগ্নিকাণ্ডে সেখানে থাকা লাখ লাখ টাকার মূল্যবান আইনি বই এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। প্রসিকিউটর নোমানের দাবি অনুযায়ী, এতে তাঁর আনুমানিক ৮০ লাখ টাকার মতো আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব: নাশকতার গভীর সন্দেহ

প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আল নোমান ঘটনার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র ও নাশকতার অভিযোগ এনে বলেন, “আমার চেম্বারের দাপ্তরিক সহকারী মো. আবদুস সালাম গতকাল রাত ১২টা ৪৭ মিনিটে আমাকে ফোন করে চেম্বারে আগুন লাগার খবর জানান। কিন্তু অত্যন্ত রহস্যজনক বিষয় হলো, রাত ১২টা ২৭ মিনিটের পর থেকে আমার চেম্বারের আউটডোরে (বাইরে) থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার কোনো রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে না। ১২টা ২৭ মিনিট থেকেই সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে ‘নো রেকর্ড’ দেখাচ্ছে।”

তিনি অভিযোগ করেন, হয় আগুনে সিসিটিভি ক্যামেরাটি পুড়ে গেছে, নয়তো আগুন দেওয়ার আগে কেউ সিসিটিভি ক্যামেরার মেমোরি কার্ড সরিয়ে ফেলেছে।

বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট বা কোনো দুর্ঘটনা থেকে এই আগুন লাগেনি দাবি করে তিনি বলেন, “চেম্বারে আগুন লাগার মতো কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। সেখানে কোনো রান্না হয় না, কর্মচারীরা কেউ ধূমপানও করেন না, কোনো মশার কয়েলও জ্বালানো হয় না। এমনকি রাতে এসিও সচল ছিল না। আগুনের সূত্রপাত হয়েছে মূলত প্রধান দরজা থেকে। আর প্রধান দরবজায় প্রথমে আগুন ধরার কারণেই ভেতরে থাকা কর্মচারীরা বাইরে বের হতে পারেননি।”

বাথরুমে আশ্রয় ও ‘স্যার, আমাকে বাঁচান’— দুই তরুণের শেষ আকুতি

নিহত দুজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন— বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলার বড় ভাদাহার গ্রামের মোহাম্মদ সেলিম ও রেহেনা বিবির ছেলে আব্দুস সালাম (২০) এবং কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বাবুন্দিয়া গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে জনি (২৪)। এর মধ্যে আবদুস সালাম প্রসিকিউটর নোমানের এবং জনি ব্যারিস্টার মোয়াজের ক্লার্ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁরা দুজনে রাতের বেলা একসঙ্গেই এই চেম্বারটিতে থাকতেন।

মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্তের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, “আবদুস সালাম রাত ১২টা ৪৭ মিনিটে আমাকে ফোন দিয়ে আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘স্যার, আমাকে বাঁচান। চেম্বারে আগুন ধরছে, আমি তো বের হতে পারতেছি না।’ এ কথাই বলতে পেরেছেন আবদুস সালাম। তারপর আর ফোন ধরেননি।

ফোন পাওয়ার সাথে সাথেই প্রসিকিউটর নোমান জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল দিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে অবহিত করেন। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অনেক দেরি করে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সেখানকার এক আইনজীবীর গানম্যান সরোয়ার এবং পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রধান দরজায় আগুন ধরে যাওয়ায় ভেতরে থাকা দুই তরুণ বাঁচার জন্য ভেতরের একটি বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর তাদের বাথরুম থেকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠায়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে আব্দুস সালামকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে জনিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলে সেখানে তাঁরও মৃত্যু হয়।

নিউমার্কেট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মৃত উভয়ের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে।