সংসদ বিষয়ক প্রতিবেদক, ঢাকা | দেশের অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণ, তারল্য সংকট দূরীকরণ এবং মানুষের ঘরে জমে থাকা নগদ অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরিয়ে আনতে সাময়িকভাবে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের এক ব্যতিক্রমী প্রস্তাব দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও নোয়াখালী-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
আজ রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেন।
জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশের বর্তমান ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।
তিনি বলেন, “দেশের অনেক মানুষ এখন ব্যাংকে টাকা না রেখে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বাসায় সংরক্ষণ করছেন। আবার যাঁরা অতীতে দেশ থেকে টাকা বিদেশে পাচার করতে চেয়েছিলেন কিংবা বিগত স্বৈরাচারী শাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁরাও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ঘরে রেখে গেছেন। এর ফলে এক বিশাল অঙ্কের টাকা এখন দেশের ব্যাংকিং খাতের বাইরে রয়ে গেছে।”
২৫ শতাংশ কর দিয়ে অর্থ বৈধ করার ফর্মুলা
এই সংকট থেকে উত্তরণে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়ে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, “সরকার যদি সাময়িকভাবে এই বড় নোটগুলো বাতিল ঘোষণা করে এবং তা দুই মাসের মধ্যে ব্যাংকে জমা দেওয়ার সুযোগ দেয়, তবে দেশের অর্থনীতিতে এক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। যাঁদের ট্যাক্স ফাইলে বা আয়কর নথিতে ওই অর্থের কোনো হিসাব নেই, তাঁরা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কর বা ট্যাক্স দিয়ে তা বৈধ করার সুযোগ পাবেন।”
তিনি আরও যোগ করেন, এই প্রক্রিয়াটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের বাজেট–ঘাটতি অনেকাংশে কমবে, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট দূর হয়ে ব্যাংকগুলো শক্তিশালী হবে এবং সেই বিপুল অর্থ পরবর্তীতে দেশের উৎপাদনমুখী ও নতুন বিনিয়োগ খাতে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
‘এত ব্যাংকের দরকার কী বাংলাদেশে?’
বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলে নোয়াখালী–১ আসনের এই সংসদ সদস্য বলেন, দেশের ব্যাংকগুলোর সংখ্যা অতি দ্রুত কমিয়ে এনে জনগণের আমানতের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করে মাহবুব উদ্দিন বলেন, “টাকা নেই। ব্যাংকগুলো লুট হয়ে গেছে। এত ব্যাংক দরকার কী বাংলাদেশে? এত ব্যাংকের দরকার নেই। এমপি হলেই একটা ব্যাংক লাগবে, নেতা হলেই একটা লিজিং কোম্পানি লাগবে—এই সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকের সংখ্যা কমাতে হবে। বর্তমানে জনগণের করের টাকা দিয়ে ব্যাংকের ঘাটতি পূরণ করতে হয়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই অবিলম্বে জনগণের আমানতের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”
টাকা পাচার ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বাস্তবতা
টাকা পাচারকে দেশের অন্যতম বড় প্রধান অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সুপ্রিম কোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কথা বারবার বলা হলেও বাস্তবে একটি টাকাও ফেরানো সম্ভব হয়নি। কারণ, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় একবার অর্থ প্রবেশ করার পর তা আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জটিল ও কঠিন।
অর্থের স্বভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “টাকারও একটি নিজস্ব স্বভাব আছে। মানুষ যেখানে নিরাপত্তা অনুভব করে, সেখানেই টাকা রাখে। আমাদের দেশে এমন একটি আস্থার আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে দেশের মানুষ বিদেশে টাকা পাচার না করে দেশেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী ও নিরাপদ বোধ করে। শুধু মুখে বড় বড় আইন করলেই হবে না, পুরো ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেমের পরিবর্তন করতে হবে। সিঙ্গাপুর, দুবাই, কানাডা ও থাইল্যান্ডে মানুষ পরম আস্থার সঙ্গে অর্থ রাখে, কারণ সেখানে সেই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।”
নতুন সরকারের বাজেট চ্যালেঞ্জ ও ঘাটতি
নতুন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও তীব্র বেকারত্বের বিষয়টি সংলাপে তুলে ধরেন তিনি। যুবসমাজকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, কোটি কোটি যুবককে বেকার রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলার দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি আশা করা যায় না। দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যুবকদের জন্য কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে।
এবারের বাজেট ঘাটতির হলেও একে ‘অস্বাভাবিক নয়’ বলে মন্তব্য করেন মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই ঘাটতির বাজেট হয় এবং বাংলাদেশেও অতীতে প্রায় সব বাজেটই ঘাটতির ছিল।
সবশেষে বর্তমান সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে মাত্র তিন মাসের মধ্যে একটি বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য থেকে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। বিগত সরকারের লুটপাটের অর্থনীতি থেকে দেশকে উদ্ধারের প্রচেষ্টার মধ্যেই এই বাজেটটি এসেছে। আর এই জনকল্যাণমুখী উদ্যোগের কারণেই বাজেট নিয়ে বিরোধী বা অন্যান্য মহলে বড় ধরনের কোনো সমালোচনা দেখা যাচ্ছে না।”

