সম্প্রতি মাননীয় আইনমন্ত্রী মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আইনজীবীদের বিচার বিভাগের বাইরে সাধারণ নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বক্তব্যটির আইনগত ও সাংবিধানিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন—Judiciary বা বিচারব্যবস্থা কেবল বিচারকদের নিয়ে গঠিত নয়; Bar তথা Advocates এবং Bench তথা Judges—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
একটি রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি স্তম্ভের অন্যতম হলো Judiciary। সংবিধানের রক্ষক এবং Rule of Law-এর অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক এই প্রতিষ্ঠান। যে দেশে বিচারব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে নাগরিকের অধিকার, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারও স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিপরীতে, একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা নাগরিককে তার অধিকার সম্পর্কে নিশ্চয়তা দেয় এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর সুরক্ষা তৈরি করে।
এই বিচারব্যবস্থার অন্যতম অপরিহার্য অংশ আইনজীবী সমাজ। একজন আইনজীবী কেবল আদালতে কোনো পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন না; তিনি একই সঙ্গে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার অংশ, আইনের শাসনের একজন বাস্তবায়নকারী এবং নাগরিক অধিকারের অন্যতম রক্ষক। তাই বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে Bar এবং Bench—উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
স্থানীয় বারে সদস্যপদ: নতুন কিছু প্রশ্ন
সম্প্রতি রংপুর বারে সদস্যপদ গ্রহণের ক্ষেত্রে আইনজীবীদের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়ার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে এসেছে। বিশেষ করে যেসব আইনজীবীর বয়স ৩২ বছরের বেশি, তাদের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়ার অভিযোগটি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
প্রশ্ন হলো—একজন আইনজীবীর বয়স ৩২ বছর অতিক্রম করলেই কেন তাকে মুচলেকা দিতে হবে?
আইনের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা জানেন, মুচলেকা বা undertaking-এর প্রয়োজনীয়তা সাধারণত নির্দিষ্ট আইনগত পরিস্থিতিতে দেখা যায়। এমনকি অভ্যাসগত অপরাধী বা চোরের কাছ থেকেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মুচলেকা নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু একজন ব্যক্তি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আইনজীবী হিসেবে সনদ লাভ করার পর, কেবল বয়সের ভিত্তিতে তাকে স্থানীয় বার অ্যাসোসিয়েশনের কাছে এমন মুচলেকা দিতে হবে—এর যৌক্তিকতা সহজে বোধগম্য নয়।
সমস্যার এখানেই শেষ নয়। সংবাদ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নতুন সদস্যদের সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগটি সত্য হলে এটি নিঃসন্দেহে আরও উদ্বেগের বিষয়।
বার কাউন্সিলের সনদ বনাম স্থানীয় বারের নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশের একজন আইনজীবীর পেশাগত অভিভাবক হলো Bangladesh Bar Council। বার কাউন্সিলের নির্ধারিত পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর একজন ব্যক্তি Advocate হিসেবে পেশায় প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করেন।
এক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—বার কাউন্সিল যখন একজন ব্যক্তিকে আইনজীবী হিসেবে পেশায় প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে, তখন কোনো স্থানীয় Bar Association কি এমন আর্থিক বা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে, যার ফলে একজন নতুন আইনজীবীর পেশায় প্রবেশ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে?
স্থানীয় বার অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব শৃঙ্খলা, প্রশাসন ও পেশাগত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করা সমীচীন নয়, যা বার কাউন্সিল কর্তৃক প্রদত্ত পেশাগত স্বীকৃতির কার্যকারিতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।
আমার অনুমান, স্থানীয় বারের এমন বিধিনিষেধের পেছনে একটি সম্ভাব্য যুক্তি হতে পারে—নির্দিষ্ট বারে আইনজীবীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি নির্দিষ্ট বারে আইনজীবীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আমরা কি নতুন ও সম্ভাবনাময় আইনজীবীদের জন্য প্রবেশের দরজা অযথাই সংকুচিত করছি না?
ভালো আইনজীবী তৈরি হওয়ার পথে বাধা কেন?
একটি বারে যত বেশি আইনজীবী থাকবেন, তত বেশি প্রতিযোগিতা তৈরি হবে—এটি সত্য। কিন্তু পেশাগত প্রতিযোগিতা এবং প্রশাসনিকভাবে প্রবেশের দরজা বন্ধ করে দেওয়া এক বিষয় নয়।
একজন ভালো আইনজীবীকে শেষ পর্যন্ত তার দক্ষতা, জ্ঞান, যুক্তি, পেশাগত সততা এবং আদালতে কাজের সক্ষমতার মাধ্যমেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যিনি নিজেকে ভালো আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন না, তিনি স্বাভাবিকভাবেই একসময় পেশাগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন। এটিই পেশার স্বাভাবিক filtering mechanism।
অর্থাৎ, যোগ্যতার ভিত্তিতে টিকে থাকার একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা যখন ইতিমধ্যেই রয়েছে, তখন কৃত্রিমভাবে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার প্রয়োজন কতটুকু?
এই জায়গায় আমাদের আরও একটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এমন একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, যিনি একই সঙ্গে কানাডা ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সদস্য হিসেবে আইনপেশার সঙ্গে যুক্ত, জনাব তবারক এক আলোচনায় কানাডার বার ব্যবস্থার একটি ভিন্ন দিক তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কানাডার কোনো প্রদেশে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সংখ্যক আইনজীবীকে পেশায় প্রবেশের সুযোগ না দিয়ে, সেই প্রদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনজীবীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাতে যত সংখ্যক ভালো ছাত্রই পরীক্ষা দিক না কেন! প্রয়োজনের বেশি তারা সব থেকে ভালো ইউনিভার্সিটির সব চাইতে ভালো ছাত্রকেও সুযোগ দেন না।
আমাদের বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। বাংলাদেশে বার কাউন্সিলের পরীক্ষা সাধারণত পঞ্চাশ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাস করার পর একজন আইনজীবী পেশায় প্রবেশের সুযোগ পান। কিন্তু এই ব্যবস্থার মধ্যেও প্রশ্ন থেকে যায়—দীর্ঘ একাডেমিক শিক্ষা, আইন বিষয়ে পড়াশোনা, এমসিকিউ, লিখিত, ভাইবার মতো একাধিক ধাপ পেরিয়ে একজন ব্যক্তি যখন আইনজীবী হিসেবে স্বীকৃতি পান, তখন স্থানীয় পর্যায়ে আবার কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ের বাধা তৈরি করা কতটা ন্যায়সংগত?
বার কাউন্সিল পরীক্ষাও কি নিখুঁত?
এখানে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
সাধারণভাবে বলা হয়, নির্দিষ্ট ন্যূনতম নম্বর অর্জন করলেই একজন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হন। আবার এমন উদাহরণও রয়েছে—খুব মেধাবী, ভালো যুক্তিশক্তির অধিকারী এবং আইন সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানসম্পন্ন একজন শিক্ষার্থীও বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছেন না।
এর কারণ প্রশ্নপত্রের ধরন, পরীক্ষা পদ্ধতি নাকি অন্য কোনো বিষয়—তা এক কথায় বলা কঠিন। তবে এটুকু বলা যায়, একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বা না হওয়াই কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যৎ আইনজীবী হিসেবে দক্ষতার একমাত্র পরিমাপক হতে পারে না।
কারণ আইনপেশা মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত শিক্ষার ক্ষেত্র। আদালতে নিয়মিত উপস্থিতি, সিনিয়রের অধীনে কাজ, মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা, বিচারিক যুক্তি বিশ্লেষণ, client management এবং পেশাগত নৈতিকতা—এসব বিষয় একজন আইনজীবীকে বছরের পর বছর ধরে শিখতে হয়।
তাই কেউ যদি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, তাহলে তার সামনে আবার পাঁচ-ছয় লাখ টাকার আর্থিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা কতটা যুক্তিসংগত—সেটি অবশ্যই ভেবে দেখা দরকার।
আইনপেশা কি ধনীদের জন্য?
এই প্রশ্নটি আরও গভীর।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন সদ্য আইনজীবীকে একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করে আদালতে নিয়মিত তিন থেকে পাঁচ বছর কাজ করার পর অনেক ক্ষেত্রে নিজের পেশাগত অবস্থানকে অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল করতে সময় লাগে। শুরুর বছরগুলোতে একজন জুনিয়র আইনজীবীর আয় অত্যন্ত সীমিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এমন পরিস্থিতিতে যদি কোনো তরুণ আইনজীবীকে শুধুমাত্র স্থানীয় বারের সদস্যপদ গ্রহণের জন্য কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আইনপেশায় প্রবেশের দরজা কি ধীরে ধীরে কেবল আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে?
ধরা যাক, একজন তরুণ আইনজীবী তিন লাখ টাকা দিয়ে কোনো বারের সদস্যপদ নিলেন। সেই অর্থ পরিশোধ করার পর পরবর্তী এক বছরে তিনি কত টাকা আয় করতে পারবেন—তার কোনো নিশ্চয়তা কি সংশ্লিষ্ট বার অ্যাসোসিয়েশন দিতে পারে? অবশ্যই পারে না।
বরং বাস্তবতা হলো, একজন নতুন আইনজীবীকে পরবর্তী কয়েক বছর বিনিয়োগ করতে হবে—সময়, শ্রম, মেধা এবং অর্থ। পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য তাকে শিখতে হবে, ভুল করতে হবে, আবার শিখতে হবে এবং ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
তাহলে প্রবেশের মুহূর্তেই যদি কয়েক লাখ টাকার আর্থিক বাধা তৈরি করা হয়, সেটি কি একজন সম্ভাবনাময় আইনজীবীর পেশাগত বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না?
আমরা কি ভবিষ্যতের মাহমুদুল ইসলামদের হারিয়ে ফেলছি?
ইতিহাস আমাদের শেখায়, একজন মানুষের বর্তমান পরিচয় দিয়ে তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সবসময় বিচার করা যায় না।
আজ যাকে একজন নতুন বা অনভিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে দেখা হচ্ছে, তিনিই হয়তো আগামী দিনে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইনজ্ঞ হয়ে উঠতে পারেন। আমরা জানি না, আজ যেসব তরুণ আইনজীবী স্থানীয় বারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধিনিষেধের মুখোমুখি হচ্ছেন, তাদের মধ্যে কেউ ভবিষ্যতের মাহমুদুল ইসলাম হবেন কি না।
বিচারবিভাগ পুরোপুরি স্বাধীন হওয়ার আগের সময়েও আমরা বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের মতো অসাধারণ ব্যক্তিত্ব পেয়েছি। তিনি আইন বিষয়ে প্রথাগত ডিগ্রিধারী ছিলেন না; তাঁর একাডেমিক পটভূমি ছিল অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। কিন্তু তাঁর নিরপেক্ষতা, সততা ও বিচারিক প্রজ্ঞা তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য অবস্থানে নিয়ে যায়। তিনি একবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন।
এই উদাহরণটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—মানুষের সম্ভাবনা সবসময় তার প্রাথমিক পরিচয় বা প্রচলিত যোগ্যতার কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
কেউ কেউ জন্মগতভাবেই অসাধারণ মেধা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও যুক্তিবোধ নিয়ে পৃথিবীতে আসেন। আইনপেশাতেও এমন মানুষ থাকতে পারেন। তাই আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত, যেখানে যোগ্যতা ও মেধার বিকাশের জন্য দরজা খোলা থাকে; অযথাই বন্ধ দরজা তৈরি করা না হয়।
প্রবেশফি নির্ধারণে ‘Legitimate Expectation’
স্থানীয় বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোর প্রশাসনিক ব্যয় রয়েছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সদস্যদের কল্যাণ, অবকাঠামো, লাইব্রেরি, বার ভবন, প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন খাতে অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে সদস্যপদ ফি থাকা অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ফি কত হওয়া উচিত?
একজন সাধারণ বাংলাদেশি আইনজীবীর গড় আয়, বিশেষ করে একজন নতুন আইনজীবীর সম্ভাব্য আয় বিবেচনায় না নিয়ে যদি কয়েক লাখ টাকা প্রবেশফি নির্ধারণ করা হয়, তাহলে সেটিকে কেবল প্রশাসনিক ফি হিসেবে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে।
আইনপেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে একটি legitimate expectation থাকা স্বাভাবিক যে, রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত পেশাগত যোগ্যতা অর্জনের পর একজন ব্যক্তি যুক্তিসংগত শর্তে সেই পেশায় প্রবেশ করতে পারবেন। স্থানীয় সংগঠনের আর্থিক কাঠামো এমন হওয়া উচিত নয়, যা বাস্তবে সেই প্রত্যাশাকে ব্যর্থ করে দেয়।
বিধিনিষেধ প্রয়োজন, তবে কার হাতে?
আইনপেশায় মান নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই প্রয়োজন। অনভিজ্ঞতা, পেশাগত অসদাচরণ, অনৈতিক কার্যক্রম কিংবা অযোগ্যতার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কোন প্রতিষ্ঠানের—এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন।
যদি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল আইনজীবীদের পেশাগত সনদ প্রদান ও নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হয়, তাহলে পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে মৌলিক বিধিনিষেধ তৈরির ক্ষমতাও মূলত সেই কাঠামোর মধ্যেই থাকা উচিত।
কোনো স্থানীয় বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রশাসনিক ক্ষমতা এমন পর্যায়ে যাওয়া উচিত নয়, যাতে একজন বার কাউন্সিল-সনদপ্রাপ্ত আইনজীবীর পেশাগত অধিকার কার্যত সীমিত হয়ে যায়।
Restriction প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু restriction-এরও legitimate purpose, reasonable basis এবং proportionality থাকতে হবে।
শুধু আইনজীবীর সংখ্যা কম রাখার জন্য যদি প্রবেশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আর্থিক বা প্রশাসনিক বাধা তৈরি করা হয়, তাহলে সেটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
শেষকথা
একটি শক্তিশালী Judiciary গড়ে তুলতে হলে কেবল Bench শক্তিশালী করলেই হবে না; Bar-কেও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ দক্ষ, স্বাধীন ও নৈতিক আইনজীবী ছাড়া একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা কল্পনা করা কঠিন।
একজন তরুণ আইনজীবী যখন বার কাউন্সিলের নির্ধারিত দীর্ঘ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পেশায় প্রবেশ করেন, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হওয়া উচিত তার মেধা, দক্ষতা, সততা, যুক্তি ও পরিশ্রম—তার পারিবারিক আর্থিক সামর্থ্য নয়।
আজ যদি আমরা প্রবেশের দরজা এতটাই সংকীর্ণ করে দিই যে একজন মেধাবী কিন্তু আর্থিকভাবে অসচ্ছল তরুণ আইনজীবী সেখানে প্রবেশের সুযোগ না পান, তাহলে ক্ষতিটা শুধু সেই ব্যক্তির নয়; ক্ষতিটা পুরো বিচারব্যবস্থার।
কারণ আমরা জানি না—আজকের সেই তরুণ আইনজীবীদের মধ্যেই হয়তো আগামী দিনের কোনো মাহমুদুল ইসলাম, কোনো অসাধারণ বিচারক, কোনো মানবাধিকার আইনজীবী কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ আইন সংস্কারকের জন্ম হতে পারে।
তাই স্থানীয় বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোর উচিত সদস্যপদ ও প্রবেশফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ আইনজীবীর আর্থিক সক্ষমতা, পেশায় প্রবেশের বাস্তবতা, ন্যায়সংগত প্রত্যাশা এবং বৃহত্তর বিচারব্যবস্থার স্বার্থ বিবেচনা করা।
আইনপেশার দরজা অবশ্যই মানসম্পন্ন হতে হবে—কিন্তু তা যেন অর্থের দরজা না হয়ে যায়।
একজন ভালো আইনজীবী তৈরি হতে পাঁচ বছর, দশ বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। তাকে সেই সুযোগটুকু দিতে হবে। কারণ একটি ভালো Judiciary কেবল ভালো বিচারকের মাধ্যমে নয়, ভালো আইনজীবীর মাধ্যমেও গড়ে ওঠে।
লেখক: মোঃ রওশন জাদীদ, সিনিয়র এসোসিয়েট, এমএনপি লিগ্যাল, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। Reach writer at: rawsan.zadid@yahoo.com

