মোঃ সাজিদুর রহমান শুভ : প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা যখন বাংলাদেশে আছড়ে পড়ে, তখন দেশের আনাচে-কানাচে এক অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হয়। ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে মফস্বলের বাজার পর্যন্ত ছেয়ে যায় আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা, ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ, জার্মানি, ফ্রান্স, পর্তুগাল কিংবা স্পেনের রাজকীয় হলুদ-লালের পতাকায়। মরক্কো, সেনেগাল বা ঘানার মতো আফ্রিকান দলের পতাকাও এখন আর বিরল নয় বাংলাদেশের পাড়া-মহল্লায়।
উৎসবের এই আনন্দ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই উৎসবের মাঝেই ঘটে এক নীরব অবহেলা — অনেকে প্রিয় দলের পতাকার সঙ্গে নিজের দেশের পতাকাটিও টাঙিয়ে দেন একই দড়িতে, একই উচ্চতায়, বিনা নিয়মে, বিনা বিবেচনায়। দেশপ্রেমের এই প্রকাশটুকু হয়তো আন্তরিক; কিন্তু অজ্ঞতার কারণে তা অনেক সময় হয়ে ওঠে আইনের লঙ্ঘন।
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা কোনো সাধারণ কাপড়ের টুকরো নয়। ১৯৭১ সালে লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, সবুজ জমিনের উপর রক্তলাল বৃত্তে গাঁথা এই পতাকা সেই আত্মদানের জীবন্ত প্রতীক। তাই এই পতাকার প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করা উচিত, তার একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোও রয়েছে — যা অধিকাংশ নাগরিকেরই অজানা।
আমাদের পতাকার আইনি কথা
স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে প্রণীত হয় ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যান্থেম, ফ্ল্যাগ অ্যান্ড এমব্লেম অর্ডার, ১৯৭২’ (রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ১৩০)। একই বছর প্রণীত হয় ‘বাংলাদেশ পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২’। এই আইন ও বিধিমালায় জাতীয় পতাকার আকার, রং, উত্তোলনের নিয়ম এবং বিদেশি পতাকার ব্যবহার সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪(২) অনুচ্ছেদে পতাকার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বলা আছে:
‘প্রজাতন্ত্রের জাতীয় পতাকা হইতেছে সবুজ ক্ষেত্রের উপর স্থাপিত রক্তবর্ণের একটি ভরাট বৃত্ত’।
আইন অনুযায়ী, জাতীয় পতাকার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত হবে ১০:৬।
-
সবুজ পটভূমি: রঙের মান নির্ধারিত হবে প্রোসিয়ন ব্রিলিয়ান্ট গ্রিন (এইচ-২আর.এস), প্রতি হাজারে ৫০ অংশ দ্বারা অর্থাৎ গাঢ় সবুজ।
-
লাল বৃত্ত: ভেতরের বৃত্তটি হবে প্রোসিয়ন ব্রিলিয়ান্ট অরেঞ্জ (এইচ-২আর.এস), প্রতি হাজারে ৬০ অংশ মানের রক্তলাল।
বৃত্তের ব্যাসার্ধ হবে পতাকার মোট দৈর্ঘ্যের এক-পঞ্চমাংশ এবং বৃত্তের কেন্দ্র পতাকার ঠিক মাঝখান থেকে সামান্য ডানদিকে স্থাপিত হবে, যেন উড়ন্ত অবস্থায় তা সর্বদা মাঝখানে দেখায়। এই বিধি না মেনে তৈরি পতাকা ব্যবহার করাও আইনের পরিপন্থী।
পতাকা উত্তোলনের সময়সীমা ও বিশেষ বিধান
আইন অনুযায়ী, পতাকা সাধারণত সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উত্তোলিত থাকবে। তবে জাতীয় সংসদের রাতের অধিবেশন, রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানসহ বিশেষ রাষ্ট্রীয় আয়োজনে রাতেও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা যেতে পারে।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, চিফ হুইপ, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, মন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও কনস্যুলার মিশনের প্রধানগণ তাঁদের সরকারি যানবাহনে সর্বদা জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে পারেন। প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা রাজধানীর বাইরে সরকারি সফরে কিংবা বিদেশ ভ্রমণকালে তাঁদের মোটরযান ও জলযানে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অধিকারী। এদের বাইরে অন্য কোনো ব্যক্তি সরকারের বিশেষ অনুমতি ব্যতীত মোটরযান বা জলযানে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে পারবেন না।
পতাকা বিধিমালা অনুযায়ী—মহানবী (সা.)-এর জন্মবার্ষিকী (ঈদে মিলাদুন্নবী), ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস, কোনো শোক দিবস এবং সরকার কর্তৃক ঘোষিত অন্যান্য বিশেষ দিবস ব্যতীত বেসরকারি ভবন বা স্থাপনায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন কিংবা অর্ধনমিত রাখা আইনসম্মত নয়।
বিদেশি পতাকা উত্তোলনে যা জানা দরকার
বিশ্বকাপের সময় যাঁরা আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকা টাঙান, তাঁদের জানা দরকার যে পতাকা বিধিমালায় বিদেশি পতাকা উত্তোলনের বিষয়ে স্পষ্ট বিধি রয়েছে। আইন অনুযায়ী, শুধুমাত্র বাংলাদেশে অবস্থিত কূটনৈতিক মিশন, কনস্যুলার অফিস এবং রাষ্ট্রীয় সফরে আসা বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে বিদেশি পতাকা উত্তোলন করা যাবে। এর বাইরে সরকারের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়া বিদেশি রাষ্ট্রের পতাকা কোনো গাড়িতে বা ভবনে উত্তোলন করা যাবে না।
তবে সামাজিক অনুষ্ঠান বা উৎসবে পতাকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যাখ্যা প্রয়োগে কিছু নমনীয়তা থাকলেও, দেশীয় পতাকার সঙ্গে বিদেশি পতাকা উড়ানো হলে সুনির্দিষ্ট বিধি জানতেই হবে। আইনসম্মতভাবে একাধিক পতাকা উত্তোলন করতে চাইলে ‘বাংলাদেশ পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২’ অনুসারে:
-
প্রথমত: বাংলাদেশের পতাকাকে সর্বদা সম্মানের স্থানে রাখতে হবে। দুটি পতাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পতাকা ডানদিকে থাকবে।
-
দ্বিতীয়ত: দুইয়ের বেশি পতাকার ক্ষেত্রে বিজোড় সংখ্যায় বাংলাদেশের পতাকা মাঝখানে এবং জোড় সংখ্যায় মাঝের ডানদিকে থাকবে।
-
তৃতীয়ত: বাংলাদেশের পতাকার উপরে অন্য কোনো পতাকা উত্তোলন করা যাবে না — কোনো অবস্থাতেই নয়।
-
চতুর্থত: প্রতিটি পতাকা পৃথক দণ্ডে উত্তোলন করতে হবে এবং সব পতাকা প্রায় সমান আকারের হতে হবে।
-
পঞ্চমত: শোভাযাত্রার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পতাকাশোভাযাত্রার মধ্যভাগে রাখতে হবে।
-
ষষ্ঠত: অন্যদেশের পতাকার সঙ্গে উত্তোলনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পতাকা সর্বপ্রথম তোলা হবে এবং সর্বশেষে নামানো হবে।
পতাকাব্যবহারে যা নিষিদ্ধ
পতাকা বিধিমালায় কিছু নিষেধাজ্ঞা স্পষ্টভাৰে উল্লেখ আছে:
-
পতাকার উপর কোনো কিছু লেখা বা ছাপানো যাবে না।
-
পতাকাকে আচ্ছাদন বা মোড়ক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
-
পতাকা ভূমি বা পানি স্পর্শ করতে পারবে না।
-
পতাকা আনুভূমিকভাবে বহন করা যাবে না।
-
কোনো পণ্যের ট্রেডমার্ক বা বিজ্ঞাপনে পতাকা ব্যবহার করা যাবে না।
-
ছেঁড়া বা নোংরা পতাকা উত্তোলনও সম্মানহানিকর।
-
পুরনো ও ব্যবহারের অযোগ্য পতাকা মর্যাদার সঙ্গে পুড়িয়ে বা মাটিতে সমাহিত করে নিষ্পত্তি করতে হবে।
অবমাননার শাস্তি
১৯৭২ সালে আইন প্রণীত হলেও দীর্ঘদিন শাস্তির বিধান অনুপস্থিত ছিল। ২০১০ সালের জাতীয় সংসদে সংশোধনী পাস করে আইনে পতাকা অবমাননার শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়। বর্তমান আইনে পতাকা অবমাননার জন্য ১ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড-এর বিধান রয়েছে।
সচেতনতাই প্রথম পদক্ষেপ
এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো ফুটবলপ্রেমীকে হেয় করা নয়, বরং তাঁদের সচেতন করা। বিশ্বকাপের উৎসব আনন্দের, কিন্তু সেই আনন্দ যেন আমাদের নিজেদের বা অন্যদের পরিচয়ের প্রতীককে ক্ষত না করে। একটি জাতির পতাকা তার ইতিহাস, সংগ্রাম ও গৌরবের সাক্ষী। নিজের এবং অন্যের পতাকার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা দেখানো শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্বও বটে।
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের জন্য সমর্থন রাখুন মনে, গলায়, জার্সিতে। কিন্তু পতাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে আইন মানুন, নিজের এবং অন্যের দেশের পতাকার মর্যাদা রক্ষা করুন।
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

