কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর তথ্য প্রচার এবং সাইবার গুজব বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থমূলক রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে।
আজ সোমবার (২২ জুন) জনস্বার্থে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই রিট আবেদনটি দায়ের করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ও ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিল (এনএলসি)-এর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস. এম. জুলফিকুর আলী (জুনু)।
এই রিট আবেদনে সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিবাদী (Respondent) করা হয়েছে। রিটের বিবাদীরা হলেন— স্বরাষ্ট্র সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, সিআইডির প্রধান এবং সিআইডি সাইবার পুলিশ সেন্টারের প্রধান।
জনমনে বিভ্রান্তি ও আইনি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা
দায়েরকৃত রিট আবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বেশ কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল এবং অন্যান্য ডিজিটাল ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর এবং মানহানিকর তথ্য ও ভিডিও কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে। এসব অপপ্রচার ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ডের ফলে সাধারণ জনমনে তীব্র বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, এই ধরনের বেআইনি সাইবার কার্যক্রম বন্ধে ইতিপূর্বে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ লিখিত আবেদন ও প্রতিনিধিত্বপত্র দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও অপপ্রচার ঠেকাতে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান বা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। ফলশ্রুতিতে, জনস্বার্থ রক্ষায় দেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে মহামান্য হাইকোর্টের সরাসরি আইনি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
রিটে যেসব সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে
রিট আবেদনে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাইবার অপরাধ দমনে কয়েকটি জরুরি নির্দেশনা জারির আর্জি জানানো হয়েছে:
-
অপপ্রচারে লিপ্ত সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও পেজগুলোর কার্যক্রম অবিলম্বে তদন্ত করা।
-
সন্দেহভাজন পোর্টাল ও পেজগুলোর প্রকৃত মালিকানা, অর্থায়নের উৎস এবং সরকারি নিবন্ধন যাচাই করা।
-
ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারিত সমস্ত আইনবিরোধী ও মানহানিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ বা মুছে ফেলা।
-
প্রয়োজনে দেশের সাইবার নিরাপত্তা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট ক্ষতিকর প্ল্যাটফর্ম, লিংক বা ইউআরএল (URL) সম্পূর্ণ বন্ধ বা ব্লক করে দেওয়া।
-
ডিজিটাল নিরাপত্তা ভঙ্গকারী ও অপপ্রচারকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আবেদনকারী আইনজীবী এস. এম. জুলফিকুর আলী (জুনু) রিট দায়ের শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতা আমাদের গণতান্ত্রিক সংবিধানের অন্যতম মূল ভিত্তি। তবে মিথ্যা তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, সাইবার হয়রানি ও মানহানিকর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আওতাভুক্ত হতে পারে না। রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি, আইনের শাসন এবং সামগ্রিক জনস্বার্থ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখন কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।”
শুনানির সপক্ষে রিট আবেদনের সাথে অপপ্রচারমূলক বিভিন্ন অনলাইন কনটেন্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কিত পোস্টের স্ক্রিনশট এবং পূর্বে কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিলকৃত চিঠির অনুলিপি সংযুক্ত করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে এই রিট আবেদনটির ওপর প্রাথমিক শুনানি হতে পারে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

