কোর্ট রিপোর্টার, চাঁদপুর | সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এবং প্রচলিত আইনের তোয়াক্কা না করে খোদ সরকারি খাস জমি দখলপূর্বক বহুতল ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন আদালত। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা বাজারে সরকারি খাস জমি অবৈধভাবে গ্রাস করে পাঁচতলা ভবন নির্মাণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত (Suo Moto) ফৌজদারি মামলা গ্রহণ করেছেন আদালত।
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ বর্ধন স্বপ্রণোদিত হয়ে এই মামলাটি গ্রহণ করেছেন। তিনি দেশের প্রচলিত ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’-এর অধীনে অপরাধটি আমলে নিয়ে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী খোকন দেবনাথের বিরুদ্ধে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন (Summon) জারির নির্দেশ প্রদান করেছেন।
ফরিদগঞ্জ আমলি আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ৭ মে ২০২৬ তারিখে চাঁদপুরের একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় “ফরিদগঞ্জে সরকারি জমি দখল করে বহুতল ভবন” শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি আদালত ও বিচারকের সরাসরি নজরে আসে।
রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষায় আদালত তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি আমলে নেন এবং ঘটনার প্রকৃত সত্যতা উদঘাটনের জন্য ফরিদগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডকে সরেজমিন অনুসন্ধান করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন : চাঁদপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৫ সদস্যের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন
আদালতের নির্দেশনার আলোকেই ফরিদগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থল রূপসা বাজারে গিয়ে আধুনিক ভূমি জরিপের মাধ্যমে সরেজমিন তদন্ত পরিচালনা করেন এবং পরবর্তীতে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এসিল্যান্ডের দাখিলকৃত সেই অফিশিয়াল তদন্ত প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয় যে:
ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৪০ নম্বর রূপসা মৌজার ১ নম্বর খতিয়ানের ৩২৪২ নম্বর আরএস দাগের ০.০০৩৩ একর সরকারি খাস জমি অভিযুক্ত ব্যবসায়ী খোকন দেবনাথ সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তার নিজস্ব ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির সঙ্গে যুক্ত করে গ্রাস করেছেন। শুধু তাই নয়, সরকারি সম্পত্তি ও খাস জমির ওপর তিনি একটি বিশাল পাঁচতলা ভবন অবৈধভাবে নির্মাণ করেছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ভূমি প্রশাসন থেকে মৌখিক ও লিখিতভাবে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে খাস জমিতে ভবনের নির্মাণকাজ জোরপূর্বক অব্যাহত রাখা হয়েছিল। এই কারণে সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে আত্মসাৎ, দখল ও ব্যবহার করার দায়ে খোকন দেবনাথকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়।
সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ বর্ধন মামলার সার্বিক নথিপত্র ও এসিল্যান্ডের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তাঁর আইনি পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, সরকারি খাস সম্পত্তি অবৈধভাবে দখলে রাখা এবং সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করা ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’-এর ১১ ধারার আওতাভুক্ত একটি মারাত্মক ও শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। তদন্ত প্রতিবেদনে উত্থাপিত এই গুরুতর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মেলায় আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি আমলে নিয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আদালতে সশরীরে হাজিরার সমন জারির চূড়ান্ত আদেশ দেন।
ফরিদগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দারা আদালতের এই সাহসী ও স্বতঃপ্রণোদিত উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলছেন, চাঁদপুর অঞ্চলের বিভিন্ন হাট-বাজার ও নদী তীরবর্তী সরকারি খাস জমি যেভাবে একশ্রেণীর প্রভাবশালী মহল দখল করে চলেছে, তার বিরুদ্ধে আদালতের এই তাৎক্ষণিক সমন জারি দখলবাজদের জন্য একটি অত্যন্ত কঠোর ও গুরুত্বপূর্ণ হুঁশিয়ারি বার্তা হিসেবে কাজ করবে।

