পাবনায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান ও সামারি ট্রায়াল
এই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

পাবনায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান ও সামারি ট্রায়াল: ২ দিনে ৪৭ মামলা নিষ্পত্তি, ৮১ জনের সাজা

স্টাফ রিপোর্টার, পাবনা | পাবনা জেলাকে মাদকের মরণছোবল থেকে রক্ষা, সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সমাজে অপরাধপ্রবণতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে জেলা আদালত ও পুলিশ প্রশাসন। পাবনায় বিশেষ মাদকবিরোধী যৌথ অভিযান ও তাৎক্ষণিক ‘সংক্ষিপ্ত বিচার’ বা সামারি ট্রায়ালের (Summary Trial) মাধ্যমে মাত্র ২ দিনে ৮১ জন মাদকসেবীর সাজা নিশ্চিত করে ব্যাপক সাড়া ও ইতিবাচক আলোড়ন সৃষ্টি করা হয়েছে।

আদালত ও পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পাবনার চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং পাবনা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ছুফি উল্লাহর সরাসরি সমন্বিত উদ্যোগে ও যৌথ পরিকল্পনায় এই বিশেষ অভিযান ও সামারি ট্রায়াল কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

চলমান এই বিশেষ তামাক ও মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে গত শুক্রবার ও শনিবার (সাপ্তাহিক ছুটির দিন) জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাবনা জেলা পুলিশ একযোগে বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে।

সাপ্তাহিক ছুটির দুই দিনজুড়েই জেলার বিভিন্ন থানার পুলিশ মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে। অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া মূল মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়।

অন্যদিকে, গ্রেপ্তারকৃত মাদকসেবীদের দ্রুততম সময়ে ‘ডোপ টেস্ট’ সম্পন্ন করা হয়। ডোপ টেস্টের পজিটিভ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আদালতে সামারি ট্রায়াল বা সংক্ষিপ্ত বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ছুটির দিনেই এই বিশেষ সামারি ট্রায়াল এজলাস পরিচালনা করেন পাবনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মতিউর রহমান এবং জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা তাবাসসুম-ই-জান্নাত।

আরও পড়ুন : বরিশালে সংক্ষিপ্ত বিচারে বাড়ছে জনআস্থা: মাত্র ১ মাসে ১৬৭ মামলায় ৪৫৭ অপরাধীর কারাদণ্ড

বিচারকদ্বয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সামারি ট্রায়াল সম্পন্ন করে ২ দিনে মোট ৪৭টি মামলা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করেন। নিষ্পত্তিকৃত মামলাগুলোতে মোট ৭৯ জন মাদকসেবিকে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন মেয়াদের কঠোর কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া অপরাধের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ২ জন আসামিকে সংশোধনের সুযোগ দিয়ে ‘প্রবেশনে’ (Probation) মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ৮১ জন আসামির আইনি ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে এই ২ দিনে। তবে কয়েকটি মামলায় অধিকতর সামাজিক ও দাপ্তরিক সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রয়োজন হওয়ায়, আদালত সেগুলো মুলতবি রেখে পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য রবিবার দিন ধার্য করেছেন।

আইন ও বিচার সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতিই করে না; এটি মূলত পারিবারিক অস্থিরতা, সামাজিক অবক্ষয়, খুন-ছিনতাই এবং নানা ধরনের জঘন্য অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অনুঘটক। তাই মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে এমন ধারাবাহিক ও তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের অবধারিত ধ্বংসলীলা থেকে রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পাবনার সচেতন নাগরিক সমাজ ও আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান এবং সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে অপরাধীদের তাৎক্ষণিক সাজা নিশ্চিত হওয়ায় সমাজে একটি অত্যন্ত কার্যকর আইনি বার্তা পৌঁছে গেছে। এর ফলে অপরাধীদের মনে যেমন ভীতির সৃষ্টি হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের মাঝে আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে—যা একটি মাদকমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গঠনের জাতীয় প্রচেষ্টাকে আরও বেশি শক্তিশালী ও বেগবান করবে।