মনজিলা ঝুমা
মনজিলা ঝুমা

পাহাড়ে নারী নেতৃত্বের বাস্তবতা: জাতিসত্তা, রাজনীতি ও অন্তর্দ্বন্দ্ব

মনজিলা ঝুমা : পাহাড়ের সমাজ কাঠামো, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ভিন্নতা নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এক জটিল বাস্তবতার সৃষ্টি করেছে। খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন জাতিসত্তার নারীদের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়ে, যা কেবল ব্যক্তিগত সক্ষমতা নয়, বরং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিসত্তাভিত্তিক নেতৃত্বের স্বীকৃতি রয়েছে। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের নারীরা দীর্ঘদিন ধরেই সমাজের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। হেডম্যান, কারবারি, চেয়ারম্যান বা ভাইস-চেয়ারম্যানের মতো পদে তাদের উপস্থিতি কেবল আনুষ্ঠানিক নয়, বরং কার্যকর ও সম্মানজনক। এই সম্প্রদায়গুলোতে নারীর নেতৃত্বকে তাদের জাতিসত্তার গৌরবের অংশ হিসেবে দেখা হয়। ফলে একজন নারী নেতৃত্বে এলে তার পরিচয়, সংস্কৃতি ও অবদান—সবকিছুই সমন্বিতভাবে মূল্যায়িত হয়।

অন্যদিকে, বাঙালি নারীদের নেতৃত্বে মুখ্য পদে নারীর উপস্থিতি তুলনামূলক কম এবং অন্তর্নিহিত বাধা লক্ষ করা যায়। পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালি নারীদের ক্ষেত্রে ক্ষমতায়ন অনেকটাই এই এলাকার বাঙালি পুরুষদের হাতে নির্ভরশীল। এখানে নারী নেতৃত্বের প্রধান বাধা বাহ্যিক নয়, বরং অভ্যন্তরীণ। নিজস্ব বলয়, আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রবণতা এবং পারস্পরিক প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব—এসব কারণে একজন বাঙালি নারী নেতৃত্বে এগিয়ে আসতে গেলে তাকে নিজের সমাজের মধ্যেই নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, অন্যের সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার মানসিকতার অভাব, যা নারী নেতৃত্বের বিকাশে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন : অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ অধ্যাদেশ বিল আকারে সংসদে পাশ

জাতীয় রাজনীতি বনাম স্থানীয় বাস্তবতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বাঙালি সমাজে একটি প্রবণতা হলো, সবকিছু জাতীয় রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা। এর ফলে স্থানীয় বাস্তবতা, পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ প্রেক্ষাপট ও নারীর নিজস্ব সংগ্রাম অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়। যেখানে পাহাড়ি জাতিসত্তাগুলো তাদের নারীদের অগ্রযাত্রাকে সম্মিলিতভাবে সমর্থন করে, সেখানে বাঙালি সমাজ অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে নিজেদের নারীদের পিছিয়ে দেয়।

পরিচয়ের সংকট ও স্বীকৃতির প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একজন চাকমা, মারমা বা ত্রিপুরা নারীকে তার জাতিসত্তা যেভাবে শক্তি ও পরিচয়ের উৎস হিসেবে তুলে ধরে, বাঙালি নারীদের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। বরং অনেক সময় তাদের পরিচয়কে ছোট করে দেখা হয় বা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে তাদের কাজ ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

নারীদের অগ্রযাত্রার পথে পাহাড়ের নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি অবমূল্যায়নের শিকার হন। অনেক মেধাবী ও সম্ভাবনাময় নারী দলাদলি ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে পিছিয়ে পড়েন; তাদের যোগ্যতা প্রাপ্য স্বীকৃতি পায় না।

পাহাড়ের নারীদের অবমূল্যায়ন ও পিছিয়ে পড়ার এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি, নীতিনির্ধারক ও নেতৃত্বে থাকা মানুষদের দায়িত্বশীল ও আন্তরিক ভূমিকা রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, যোগ্যতার ভিত্তিতে নারীদের সামনে এগিয়ে আনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে দলাদলি বা ব্যক্তিস্বার্থ কোনোভাবেই মেধার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে। একই সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে এমন একটি সহযোগিতামূলক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা থাকবে।

মেধাবী ও সম্ভাবনাময় নারীদের চিহ্নিত করে তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, নেতৃত্বের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে তারা নিজেদের সক্ষমতা পূর্ণভাবে বিকশিত করতে পারেন। পাশাপাশি সমাজে নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সচেতনতা বাড়ানো, নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নারীদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সফল নারীদের সামনে এনে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।

আরও পড়ুন : অধস্তন আদালতের ২৮ বিচারককে শোকজ করেছে আইন মন্ত্রণালয়

সর্বোপরি, আন্তরিকতা, ন্যায্যতা এবং দূরদর্শী চিন্তাভাবনার মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করলেই পাহাড়ের নারীরা তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অবস্থান অর্জন করতে সক্ষম হবেন।

পাহাড়ে নারী নেতৃত্বের এই বৈষম্য দূর করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মানবোধ গড়ে তোলা, নারী নেতৃত্বকে দলীয় বা আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয় বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা, এবং স্থানীয় বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি।

নারীরা তখনই এগিয়ে যাবে, যখন সমাজ তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথকে সহজ করবে—কঠিন নয়। পাহাড়ের বাস্তবতা আমাদের শেখায়, নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঐক্য, সম্মান ও সম্মিলিত সমর্থন। আর এই জায়গাতেই আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট