বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সিসা লাউঞ্জ ইস্যুতে হাইকোর্টে ডিএমপি কমিশনারকে স্বশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের আবেদন

ঢাকা: রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে পরিচালিত সিসা বা হুক্কা লাউঞ্জ বন্ধে হাইকোর্ট বিভাগের জারি করা নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে স্বশরীরে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ চেয়ে আদালত অবমাননার আবেদন করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম জুলফিকার আলী জুনু হাইকোর্ট বিভাগে এ আবেদন দায়ের করেন। আবেদনটি রিট পিটিশন নং ১১১৮ অব ২০২৬-এর ধারাবাহিকতায় সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদ এবং Contempt of Courts Act, 2013 অনুযায়ী দাখিল করা হয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, জনস্বার্থে দায়ের করা রিটে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা সিসা/হুক্কা লাউঞ্জে তামাকজাত দ্রব্য ও মাদকসদৃশ উপাদান সেবনের অভিযোগ তুলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চাওয়া হয়। রিটে বলা হয়, বিভিন্ন অভিজাত ও আবাসিক এলাকায় পরিচালিত এসব লাউঞ্জ বিদ্যমান Smoking and Tobacco Products Usage (Control) Act, Narcotics Control Act এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন লঙ্ঘন করে পরিচালিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন : সরকারি খরচে আইনি সহায়তা পেলেন সাড়ে ১৪ লাখের বেশি অসচ্ছল বিচারপ্রার্থী: লিগ্যাল এইডের প্রতিবেদন

রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে হাইকোর্ট বিভাগ রুল জারি করেন। একই সঙ্গে আবেদনকারীর ৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের আবেদন ৬০ দিনের মধ্যে আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে ডিএমপি কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

কিন্তু আদালতের নির্দেশনার নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম হলেও ডিএমপি কমিশনার আবেদনটি নিষ্পত্তি করেননি এবং অবৈধ সিসা/হুক্কা লাউঞ্জের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো অভিযান বা দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে আদালত অবমাননার আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

আবেদনে বলা হয়, রাজধানীর বনানী, গুলশান, ধানমন্ডি, উত্তরা এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় এখনও প্রকাশ্যে অবৈধ সিসা লাউঞ্জ পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে তামাকজাত দ্রব্যের পাশাপাশি মাদকসদৃশ উপাদান ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে, যা তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

আদালত অবমাননার আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদা ও আইনের শাসনের পরিপন্থী। সংবিধানের ১১১ ও ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের সাংবিধানিক দায়িত্ব বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আবেদনকারী দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতের নির্দেশ অমান্য করেছেন এবং এ ধরনের আচরণ Contempt of Courts Act, 2013 অনুযায়ী আদালত অবমাননার শামিল।

আদালতের কাছে আবেদনে যেসব নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে:

  • ডিএমপি কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার নোটিশ জারি;
  • সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বশরীরে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ;
  • আদালতের আদেশ অমান্যের দায়ে আইন অনুযায়ী শাস্তি প্রদান;
  • সারা দেশে অবৈধ সিসা/হুক্কা লাউঞ্জের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ;
  • আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা।

রিট আবেদনকারী অ্যাডভোকেট এস এম জুলফিকার আলী জুনু বলেন, “মাননীয় হাইকোর্ট দেশের জনস্বাস্থ্য, তরুণ সমাজ এবং আইনের শাসনের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেছেন। কিন্তু বাস্তবে যদি অবৈধ সিসা লাউঞ্জ চলতেই থাকে, তাহলে তা আদালতের আদেশের প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা হিসেবে বিবেচিত হবে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। কিন্তু বাস্তবে যদি প্রকাশ্যে সিসা লাউঞ্জ পরিচালিত হয় এবং প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।”

আইনজীবী মহলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে গাফিলতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদালত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে পারেন। একই সঙ্গে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত উপস্থিতি ও ব্যাখ্যা চাওয়ার মাধ্যমে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন বলেও মত দেন তারা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সিসা বা হুক্কা সেবনকে অনেক সময় সাধারণ ধূমপানের তুলনায় কম ক্ষতিকর হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। তরুণদের মধ্যে এ সংস্কৃতি বিস্তার রোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং নিয়মিত নজরদারি জরুরি বলে তারা মনে করেন।