ধ'র্ষ'ণ মামলার বিচার ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব কি না?
মাসুদুর রহমান

শিশু যৌন হয়রানি: নীরবতার আড়ালে এক ভয়াবহ সামাজিক সংকট

একটি শিশুর শৈশব হওয়ার কথা নির্ভয়, আনন্দময় ও স্বপ্নে পরিপূর্ণ। যে বয়সে তার পৃথিবীজুড়ে থাকার কথা বই-খাতা, খেলাধুলা, বন্ধুত্ব আর নতুন কিছু শেখার আনন্দ, সেই বয়সেই যদি তাকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়, তবে এর চেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা আর কী হতে পারে? আমরা উন্নয়নের কথা বলি, শিক্ষার প্রসারের কথা বলি, একটি আধুনিক ও মানবিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখি। অথচ সেই সমাজেই অসংখ্য শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা আজও বড় চ্যালেঞ্জ।

পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক পরিসর—যেখানেই হোক, শিশু যৌন হয়রানির প্রতিটি অভিযোগ আমাদের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। কারণ, একটি শিশু যখন তার চারপাশের মানুষকে বিশ্বাস করতে ভয় পায়, তখন ব্যর্থতা শুধু একটি পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের নয়; সেই ব্যর্থতার দায় সমাজকেও বহন করতে হয়। শিশু যৌন হয়রানি তাই কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধের বিষয় নয়, এটি আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের এক কঠিন পরীক্ষা।

টঙ্গীর ঘটনা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?

সম্প্রতি গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সেই বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনেছে। গত ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টঙ্গীর মধ্য আউচপাড়ার ক্বরীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শিশুটিকে যৌন হয়রানি এবং ঘটনা প্রকাশ করলে মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

আতঙ্কিত শিশুটি মাদ্রাসায় যেতে অনীহা প্রকাশ করলে পরিবারের সদস্যরা তার কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পারেন। পরে শিশুটির বাবা মামলা করেন এবং পুলিশ অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে। ২২ অক্টোবর আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর এবং মাদ্রাসায় ভাঙচুরের পাল্টা অভিযোগও ওঠে।

অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। তাই নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সত্য উদ্‌ঘাটন হওয়া জরুরি। তবে ঘটনাটি একটি গভীর প্রশ্ন সামনে আনে—যে প্রতিষ্ঠানে অভিভাবকেরা সন্তানকে জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষা অর্জনের জন্য পাঠান, সেখানে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে নেবে?

ধর্মীয় কিংবা সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—কোনো পরিচয়ই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার প্রকৃত পথ অভিযোগ আড়াল করা নয়; বরং সত্য উদ্‌ঘাটন, শিশুর সুরক্ষা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

নীরবতার সংস্কৃতি অপরাধীর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে

শিশু যৌন হয়রানির সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর একটি হলো একে ঘিরে গড়ে ওঠা নীরবতার সংস্কৃতি। অনেক শিশু বুঝতেই পারে না, তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া আচরণটি কতটা অন্যায়। কেউ বুঝতে পারলেও ভয়, হুমকি, অপরাধীর প্রভাব কিংবা পরিবারের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় মুখ খুলতে সাহস পায় না। কখনো আবার সামাজিক সম্মান ও লোকলজ্জার অজুহাতে পরিবারের সদস্যরাই ঘটনা প্রকাশে অনীহা দেখান।

অথচ এই নীরবতা সমস্যার সমাধান করে না, বরং অপরাধীর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। আমাদের সমাজে এমন এক অমানবিক প্রবণতাও রয়েছে, যেখানে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, অথচ অভিযুক্তের আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা যথাযথ গুরুত্ব পায় না।

একটি শিশুর অভিযোগ শোনার পর তাকে অবিশ্বাস করা, দোষারোপ করা কিংবা চুপ থাকতে বাধ্য করা তার ওপর আরেক ধরনের মানসিক নির্যাতন। মনে রাখতে হবে, যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার জন্য কোনো শিশু দায়ী নয়। লজ্জা শিশুর নয়, অপরাধীর; কলঙ্ক ভুক্তভোগীর নয়, বরং সেই মানসিকতার, যা অন্যায়কে আড়াল করে।

সমাজের প্রকৃত মানবিকতা প্রকাশ পায় তখনই, যখন সবচেয়ে অসহায় মানুষটির কণ্ঠস্বরও সমান গুরুত্ব পায়।

শিশুর মানসিক সুরক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি

যৌন হয়রানির ক্ষত সব সময় চোখে দেখা যায় না। একটি শিশুর শরীরে দৃশ্যমান আঘাত না থাকলেও তার মনে গভীর ভয়, উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে। যে শিক্ষকের কাছে শিশুর শেখার কথা, যে পরিবেশে তার নিশ্চিন্তে বেড়ে ওঠার কথা, সেই মানুষ বা পরিবেশের প্রতি যদি ভীতি জন্মায়, তবে তার প্রভাব পড়তে পারে পড়াশোনা, আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশে।

তাই শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। পরিবার থেকেই শিশুদের বয়সোপযোগী ভাষায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, শরীরের ব্যক্তিগত সীমানা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। একই সঙ্গে বড়দেরও শিখতে হবে শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে এবং তার অস্বস্তিকে গুরুত্ব দিতে।

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষানীতি, নিরাপদ অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা, শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ এবং অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন যোগাযোগের ক্ষেত্রেও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশু ভয় বা সংকোচ ছাড়াই বলতে পারে, তার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।

আইনপ্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও নিরপেক্ষ বিচার অপরিহার্য

শিশু যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আবেগপ্রবণ প্রতিবাদ যেমন প্রয়োজন, তেমনি অপরিহার্য কার্যকর আইনপ্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এবং শিশু আইন, ২০১৩-এর মতো আইনি কাঠামো রয়েছে। কিন্তু আইনের অস্তিত্ব আর বাস্তবে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়।

অভিযোগ গ্রহণ থেকে তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচার পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে শিশুর মর্যাদা, গোপনীয়তা এবং মানসিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অপরাধের অভিযোগ উঠলেই গণপিটুনি কিংবা জনতার হাতে বিচার কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না। এতে আইনের শাসন দুর্বল হয় এবং প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনের প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

আবার অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন বলে অভিযোগকে উপেক্ষা করার সুযোগও নেই। টঙ্গীর সাম্প্রতিক ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশু সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে শিশুর নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ, আর জনরোষের চেয়ে নিরপেক্ষ বিচার অধিক কার্যকর।

সরকার, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিরোধমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

শিশুর নিরাপত্তা অনুগ্রহ নয়, অধিকার

একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি শুধু উঁচু ভবন, উন্নত সড়ক কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে পরিমাপ করা যায় না। সেই জাতি তার শিশুদের কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক পরিবেশ দিতে পারছে, সেটিও উন্নয়নের মৌলিক মানদণ্ড।

যে সমাজ একটি শিশুর আতঙ্ক বুঝতে পারে না, তার কান্নাকে গুরুত্ব দেয় না কিংবা তার অভিযোগকে লোকলজ্জার আড়ালে চাপা দেয়, সেই সমাজের উন্নয়ন কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শিশুর নিজের নয়; এই দায়িত্ব রাষ্ট্রের, পরিবারের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এবং সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষের।

আজ একটি শিশুর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়কে যদি আমরা কেবল সংবাদপত্রের একটি শিরোনাম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাময়িক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখি, তবে আগামীকাল একই বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর নৈতিক অধিকারও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই এখনই প্রয়োজন নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙা, অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া, অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রতিটি শিশুর জন্য ভয়মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।

শিশুর শৈশব কোনো অপরাধীর লালসা, কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম কিংবা সমাজের কথিত সম্মানের কাছে জিম্মি থাকতে পারে না। শিশুর নিরাপত্তা অনুগ্রহ নয়, অধিকার; আর সেই অধিকার রক্ষায় নীরবতা নয়, দায়িত্বশীল প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক : মাসুদুর রহমান; অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, জেলা আইনজীবী সমিতি, ফেনী।