নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘ওকালতি করে টাকা আয় করি, আবার সে টাকা আইনজীবীদের কল্যাণেই খরচ করি। দিস ইজ মাই লাইফ।’ জীবদ্দশায় গণমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এভাবেই নিজের জীবনদর্শন তুলে ধরেছিলেন দেশের প্রখ্যাত আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার। আইন পেশায় দক্ষতা, মানবিকতা ও আইনজীবীদের কল্যাণে অবদানের জন্য তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘গরিবের আইনজীবী’ হিসেবে।
আজ ২৭ অক্টোবর, এই বিশিষ্ট আইনজীবীর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের এই দিনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তাঁর কর্মময় জীবন ও আইনজীবী সমাজের কল্যাণে অবদান আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
আবদুল বাসেত মজুমদার আইনজীবীদের কল্যাণে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। দেশের ৫৮টি আইনজীবী সমিতিতে দুই লাখ টাকা করে অনুদান দিয়ে তিনি সহকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে সারাদেশের আইনজীবী সমিতিগুলোতে আইনজীবীদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে আবদুল বাসেত মজুমদার আইনজীবী কল্যাণ ট্রাস্ট।
পিতার পরামর্শে ওকালতির পথে
আবদুল বাসেত মজুমদার ১৯৩৮ সালের ১ জানুয়ারি কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার শানিচৌ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হরিচর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ষাটের দশকের শুরুতে আইন পড়ার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসেন তিনি। এক বন্ধুর পরামর্শে চাকরির জন্য আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত পিতার উৎসাহে আইন পেশায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের সেই স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, ‘আব্বা বললেন, পড়ালেখা বাদ দিয়ে কিসের চাকরি? ঢাকায় থাকতে হলে ওকালতি পড়ো, উকিল হও। সেই কথাই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ১৯৬৬ সালে হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন আবদুল বাসেত মজুমদার। এরপর দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি আইন অঙ্গনে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও বার কাউন্সিলে দায়িত্ব
আইন পেশার পাশাপাশি আইনজীবীদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আবদুল বাসেত মজুমদার। তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, সহসম্পাদক, সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলেও একাধিকবার নির্বাচিত হন তিনি।
আইনজীবীদের পেশাগত স্বার্থ সংরক্ষণ ও কল্যাণে তাঁর ভূমিকা তাঁকে সহকর্মীদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলে। পেশাগত আয় থেকে আইনজীবীদের কল্যাণে অর্থ ব্যয় করার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা তাঁর জীবনদর্শনেরই প্রতিফলন।
পরিবার ও সামাজিক কর্মকাণ্ড
১৯৬৫ সালে রওশন জাহান মেহেরুন্নেসার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন আবদুল বাসেত মজুমদার। তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে।
বড় ছেলে গোলাম মহিউদ্দিন আবদুল কাদের একজন ব্যবসায়ী। ছোট ছেলে সাঈদ আহমদ রাজা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং বার কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মেয়ে ফাতেমা আক্তার লুনা রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী এবং খাদিজা আক্তার ঝুমা উত্তরা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক।
আইন পেশার বাইরেও সামাজিক সেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর উদ্যোগে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার আন্দারিপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আবদুল বাসেত মজুমদার মাদরাসা ও এতিমখানা’। নিজ গ্রামের বাড়িতেও তিনি গড়ে তোলেন একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র।
মানবিক আইনজীবী হিসেবে স্মরণীয়
আবদুল বাসেত মজুমদারের জীবন ছিল আইন পেশা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক সম্মিলিত দৃষ্টান্ত। আইনজীবীদের আর্থিক সহায়তা, কল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁকে আইন অঙ্গনের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের কাছেও পরিচিত করে তুলেছিল।
২০২১ সালের ২৭ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুতে আইন অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তাঁর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে আইনজীবী সমাজে তাঁর অবদান, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সহকর্মীদের কল্যাণে আত্মনিয়োগের বিষয়গুলো নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে।
আইন পেশায় সাফল্যের পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সহকর্মীদের কল্যাণে নিজের উপার্জন ব্যয় করার যে দৃষ্টান্ত আবদুল বাসেত মজুমদার রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আইনজীবীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

