বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় হচ্ছে, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস চালুর উদ্যোগ
সুপ্রিম কোর্ট

আইনজীবীর ভুলে মক্কেলের ভোগান্তি কাম্য নয় : হাইকোর্টের রায়

ঢাকার একটি জমির মালিকানা নিয়ে দায়ের করা দেওয়ানি মামলায় নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য ফেরত পাঠিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে উভয় পক্ষকে নিজেদের আরজি ও লিখিত জবাব সংশোধন এবং প্রয়োজন হলে আরও সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দিয়ে ছয় মাসের মধ্যে মামলাটির বিচার শেষ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ রায় দেন। ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতের ২০১৭ সালের ১৫ জুন দেওয়া রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে দায়ের করা প্রথম আপিল মঞ্জুর করে আদালত এ আদেশ দেন।

রায়ে আদালত বলেছেন, আইনজীবীর ভুলের জন্য মক্কেলকে (বিচার প্রার্থী) ভোগান্তির শিকার হতে দেওয়া উচিত নয়। মোহাম্মদ আসিফ বনাম রাষ্ট্র মামলায় এমন যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ৮ পৃষ্ঠার ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি বুধবার (২৮ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

মামলার পটভূমি

মোহাম্মদ আসিফ বাদী হিসেবে ২০১২ সালে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতে টাইটেল স্যুট নম্বর ২৪৫/২০১২ দায়ের করেন। মামলায় তিনি ৬৭৪০ অযুতাংশ জমির স্বত্ব ঘোষণার পাশাপাশি সিটি জরিপের ১ নম্বর খতিয়ানে বিবাদীদের নামে জমি রেকর্ড করা ভুল এবং তা তাঁর ওপর বাধ্যকর নয়—এ মর্মে ঘোষণার আবেদন করেন।

বাদীর দাবি অনুযায়ী, বিরোধপূর্ণ জমি মূলত প্রশন্ন কুমার বসু ও অন্যদের নামে সি.এস. খতিয়ান নম্বর ২৭১৫-তে সঠিকভাবে রেকর্ড ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৫২ সালে নিবন্ধিত পাট্টা দলিলের মাধ্যমে জমিটি কাজী আবু সাঈদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে নিবন্ধিত কবলা দলিলের মাধ্যমে জমির মালিকানা হস্তান্তরিত হয়ে হাজী সালাহউদ্দিন ও খলিল মিয়ার কাছে যায়। খলিল মিয়া তাঁর অংশ হাজী সালাহউদ্দিনের কাছে হস্তান্তর করেন।

বাদীর বক্তব্য, হাজী সালাহউদ্দিন ১৯৮৯ সালের ৩১ মে নিবন্ধিত কবলা দলিলের মাধ্যমে তাঁর কাছে জমি বিক্রি করেন। জমিতে কারখানা স্থাপন করে তিনি ভোগদখলে ছিলেন। কিন্তু সিটি জরিপের ১ নম্বর খতিয়ানে জমি বিবাদীদের নামে রেকর্ড হওয়ায় স্থানীয় তহশিলদার তাঁর কাছ থেকে খাজনা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এ পরিস্থিতিতে জমির স্বত্ব ঘোষণা এবং ভুল রেকর্ড অকার্যকর ঘোষণার জন্য তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।

অন্যদিকে, বিবাদী হিসেবে মামলায় অংশ নেওয়া সরকারের পক্ষে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো যৌথ লিখিত জবাব দাখিল করে দাবি করে, বিরোধপূর্ণ জমির মালিক তারা। সিটি জরিপের ১ নম্বর খতিয়ানে তাদের নামে জমির রেকর্ড যথাযথভাবেই করা হয়েছে। বাদীর জমিতে কোনো স্বত্ব, অধিকার বা দখল নেই বলেও তারা দাবি করে।

নিম্ন আদালতে মামলা খারিজ

বিচার চলাকালে বাদীপক্ষ পাঁচজন সাক্ষী উপস্থাপন করে এবং বিবাদীপক্ষ একজন সাক্ষীকে পরীক্ষা করে। বাদীপক্ষের দাখিল করা দলিলগুলো ১ থেকে ১৬ নম্বর প্রদর্শনী হিসেবে এবং বিবাদীপক্ষের একটি দলিল ‘ক’ প্রদর্শনী হিসেবে চিহ্নিত হয়।

সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ শেষে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালত ২০১৭ সালের ১৫ জুন মামলাটি খারিজ করে দেন। ওই রায় ও ডিক্রিতে সংক্ষুব্ধ হয়ে বাদী মোহাম্মদ আসিফ হাইকোর্টে প্রথম আপিল দায়ের করেন।

আপিলকারীর বক্তব্য

আপিলকারীর আইনজীবী মোহাম্মদ নাজমুল হোসেন আদালতে যুক্তি দেন, বিরোধপূর্ণ জমির মূল মালিকানা, সি.এস. খতিয়ান এবং পরবর্তী নিবন্ধিত হস্তান্তর দলিলগুলোর বৈধতা বিবাদীপক্ষ চ্যালেঞ্জ করেনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জমির পূর্ববর্তী মালিকদের কাছ থেকে ধারাবাহিক নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে কাজী সালাহউদ্দিন মালিকানা অর্জন করেন এবং পরবর্তী সময়ে বাদীর কাছে জমি হস্তান্তর করেন।

আইনজীবী আরও বলেন, জমির পূর্ববর্তী আর.এস. খতিয়ানে কাজী সালাহউদ্দিনের নামে বিরোধপূর্ণ ৬৭৪০ অযুতাংশ জমির পরিবর্তে ৫৮৬৮ অযুতাংশ জমি রেকর্ড করা হয়েছিল। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মূল মামলার আরজিতে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। তাঁর মতে, বাদীর নিযুক্ত আইনজীবীর ভুলের কারণে মামলার আরজিতে ঘাটতি থেকে যায়।

এ ঘাটতি পূরণের জন্য আপিলকারী দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ ৬, বিধি ১৭ অনুযায়ী আরজি সংশোধনের আবেদন করেন। ন্যায়বিচারের স্বার্থে নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে সংশোধিত আরজি ও নতুন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য ফেরত পাঠানোর আবেদন জানান তিনি।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ রাশাদুল হাসান যুক্তি দেন, মামলার ঘটনা, পরিস্থিতি ও নথিতে থাকা সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে নিম্ন আদালত যথাযথভাবেই মামলা খারিজ করেছেন। তাই ওই রায় ও ডিক্রিতে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

খতিয়ান থাকলেই মালিকানা প্রমাণিত হয় না

হাইকোর্ট নথিপত্র ও উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে উল্লেখ করেন, কোনো খতিয়ান বা স্বত্বলিপি নিজে মালিকানার দলিল নয়। এটি সম্পত্তির দখল সম্পর্কে একটি অনুমান তৈরি করে। তবে উপযুক্ত আদালতে খতিয়ানের সঠিকতা চ্যালেঞ্জ করা হলে যে পক্ষের নামে খতিয়ান প্রস্তুত হয়েছে, খতিয়ান প্রস্তুতের ভিত্তি প্রমাণের দায় তার ওপর বর্তায়।

আদালত আরও বলেন, আগের খতিয়ানে থাকা প্রজা, তাঁদের উত্তরাধিকারী অথবা হস্তান্তরগ্রহীতাদের নামে পরবর্তী খতিয়ান প্রস্তুত হওয়া উচিত। মামলার ক্ষেত্রে আর.এস. খতিয়ান ছিল সিটি জরিপের আগের খতিয়ান। অথচ বিরোধপূর্ণ জমি সি.এস., এস.এ. কিংবা আর.এস. খতিয়ানে সরকারের নামে ছিল না। ফলে সিটি জরিপের ১ নম্বর খতিয়ানে বিবাদীদের নামে জমি রেকর্ড করার ভিত্তি কী, তা দেখানোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিবাদীপক্ষ সেই রেকর্ডের ভিত্তি দেখাতে পারেনি বলে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন।

তবে আদালত একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিও তুলে ধরেন। বাদীকে নিজের দাবিকৃত স্বত্ব মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে স্বতন্ত্রভাবে প্রমাণ করতে হবে। শুধু বিবাদীপক্ষ তার দাবি প্রমাণ করতে পারেনি—এ কারণে বাদীর পক্ষে মামলা ডিক্রি দেওয়া যায় না।

আর.এস. খতিয়ানের জমির পরিমাণে অসংগতি

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাদীর পূর্বসূরি কাজী সালাহউদ্দিনের নামে আর.এস. খতিয়ান নম্বর ৪০৭৪-তে বিরোধপূর্ণ ৬৭৪০ অযুতাংশ জমির মধ্যে মাত্র ৫৮৬৮ অযুতাংশ রেকর্ড ছিল। অথচ বাদী ওই পূর্বসূরির কাছ থেকে ৬৭৪০ অযুতাংশ জমি কেনার দাবি করেন।

আদালত বলেন, এই পার্থক্যের ব্যাখ্যা বাদী মূল আরজিতে দেননি এবং এ দাবির সমর্থনে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণও উপস্থাপন করেননি। আপিল শুনানিতে তাঁর আইনজীবী জানান, পূর্বসূরি নিবন্ধিত কবলা দলিলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ জমি অর্জন করলেও আর.এস. খতিয়ানে ভুলভাবে কম জমি রেকর্ড হয়েছিল। এ ধরনের ভুলের প্রতিকার চেয়ে আরজিতে যথাযথ বক্তব্য ও আবেদন থাকা প্রয়োজন ছিল।

আদালতের মতে, মামলার আরজি প্রস্তুতের সময় সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর ভুলের কারণে এই ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল। বাদী নিজে ওই ভুলের জন্য দায়ী ছিলেন না। তাই তাঁর নিযুক্ত আইনজীবীর ভুলের কারণে বাদীকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া উচিত নয়।

পুনর্বিচারের নির্দেশ

সব দিক বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট মনে করেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রি বাতিল করে মামলাটি পুনর্বিচারের জন্য ফেরত পাঠানো প্রয়োজন। সে অনুযায়ী, মোহাম্মদ আসিফের প্রথম আপিল মঞ্জুর করা হয় এবং ২০১৭ সালের ১৫ জুন দেওয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করা হয়।

আদালত নির্দেশ দেন, উভয় পক্ষকে নিজ নিজ আরজি ও লিখিত জবাব সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। প্রয়োজন হলে তারা অতিরিক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণও উপস্থাপন করতে পারবে। এরপর আইন অনুযায়ী মামলাটির পুনর্বিচার সম্পন্ন করতে হবে।

হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, নিম্ন আদালতকে আদেশ পাওয়ার তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে মামলার বিচার শেষ করতে হবে। আপিলে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে খরচের আদেশ দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের নথি অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

উল্লেখ্য, হাইকোর্টের এই রায়ে জমির চূড়ান্ত মালিকানা নির্ধারণ করা হয়নি; বরং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও অতিরিক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দিয়ে মামলাটি নতুন করে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।