বরিশাল ব্যুরো | বরিশালের অন্যতম প্রধান বিনোদন কেন্দ্র কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী ‘ত্রিশ গোডাউন’ এলাকায় ট্রলার ও নৌকা মাঝিদের সিন্ডিকেট এবং পর্যটক হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি অবস্থান নিয়েছেন বরিশালের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (ACMM) এবং ‘জাস্টিস অব দ্য পিস’ এস, এম, শরিয়ত উল্লাহ। বিচারকের স্ব-প্রণোদিত সময়োচিত পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘদিনের ঘাট সিন্ডিকেট ভেঙে পড়েছে এবং পর্যটকদের জন্য সুনির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা টাঙানো হয়েছে।
কীর্তনখোলার নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা ভ্রমণপিপাসু সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং ট্রলার মাঝিদের দুর্ব্যবহারের বিষয়টি সম্প্রতি বরিশালের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস, এম, শরিয়ত উল্লাহ’র নজরে আসে। বিষয়টি আমলে নিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, পর্যটকদের এভাবে জিম্মি করে ঠকানো এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা স্পষ্টত ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন’-এর চরম লঙ্ঘন।
শুধু আদেশ নয়, ঘাটে নিশ্চিত হলো ভাড়ার তালিকা
নৈরাজ্য বন্ধে বিচারক কেবল আইনি আদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি; তিনি সংশ্লিষ্ট ঘাট ইজারাদার, মাঝিদের প্রতিনিধি ও স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের আদালতে ডেকে এনে কঠোরভাবে সতর্ক করেন। একই সঙ্গে পর্যটকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাৎক্ষণিকভাবে একটি যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য ভাড়ার মূল্যতালিকা নির্ধারণের নির্দেশ দেন।
বিচারকের এই কঠোর নির্দেশনার পরই বদলে গেছে ত্রিশ গোডাউন ঘাটের চিরচেনা চিত্র। মাঝিদের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া সিন্ডিকেট ভেঙে এখন নৌকা ও ট্রলার ঘাটেই শোভা পাচ্ছে সুনির্দিষ্ট ভাড়ার অফিসিয়াল মূল্যতালিকা।
স্বস্তিতে দর্শনার্থী ও সাধারণ মানুষ
ঘাটে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা দেখে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী সাদ্দাম কিবরিয়া স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, “আগে মাঝিরা মানুষের মুখ দেখে এবং সুযোগ বুঝে গলাকাটা ভাড়া চাইত। কেউ এর প্রতিবাদ করলে সব মাঝিরা দল বেঁধে এসে সাধারণ মানুষকে অপমান ও হেনস্তা করত। এখন ঘাটে ভাড়ার তালিকা ঝুলতে দেখে সত্যিই খুব স্বস্তি লাগছে।”
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা ফরিদ উদ্দিন নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, “আগে এখানে এসে মাঝিদের সাথে ভাড়া নিয়ে দরদাম করতে গিয়ে ঘোরার মেজাজটাই খারাপ হয়ে যেত। এখন কোনো দরাদরি নেই, তালিকায় যে ভাড়া লেখা আছে, আমরা সেটাই দিচ্ছি।”
সুশীল সমাজের সাধুবাদ
অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস, এম, শরিয়ত উল্লাহ’র এই জনবান্ধব ও ব্যতিক্রমী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বরিশালের স্থানীয় সুশীল সমাজ ও পরিবেশবাদী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। তাদের মতে, পর্যটনবান্ধব জেলা হিসেবে বরিশালের ভাবমূর্তি রক্ষায় এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল জেলা কমিটির সম্পাদক রফিকুল ইসলাম এই বিষয়ে বলেন, “আমাদের দেশে আইন-কানুন অনেক আছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক দুর্ভোগ দূর করতে সেই আইনের প্রয়োগ দেখা যায় খুব কম। একজন ম্যাজিস্ট্রেট যখন নিজের স্ব-প্রণোদিত (Suo Motu) ও ‘জাস্টিস অব দ্য পিস’ ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ের এমন নৈরাজ্য থামান, তখন আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা শতগুণ বেড়ে যায়। আমরা চাই বরিশালের অন্যান্য সেক্টরেও এমন দৃশ্যমান আইনি তদারকি বজায় থাকুক।”

