আদালত প্রতিবেদক, পাবনা | সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে যে পিতা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, শেষ বয়সে এসে সেই একমাত্র ছেলে নয়নের অবহেলায় ঘরছাড়া হতে হয়েছিল পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার ১০৪ বছর বয়সী বৃদ্ধ তসীমউদ্দীন প্রামাণিককে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে এই মর্মন্তুদ খবরটি প্রকাশিত হলে তা পাবনা চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মতিউর রহমানের নজরে আসে।
সংবাদটির গভীরতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র অনুধাবন করে বিচারক গত ২৬ মে স্বপ্রণোদিত হয়ে ‘পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’-এর ৫ ধারায় একটি মামলা রুজুসহ প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে ভুক্তভোগী শতবর্ষী পিতার আবাসন, শারীরিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পাবনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-কে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ প্রদান করেন।
আদালতের এই কঠোর ও মানবিক আদেশের প্রেক্ষিতে গত ২৯ মে পাবনা সদর থানা পুলিশ ভুক্তভোগী পিতা ও অভিযুক্ত পুত্রকে সশরীরে আদালতে উপস্থাপন করে। আদালতে পিতার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে রুজু করা হয়।
তবে শুনানির সময় সৃষ্টি হয় এক অভূতপূর্ব মানবিক আবহ। আজন্ম স্নেহের টানে শতবর্ষী বৃদ্ধ পিতা তসীমউদ্দীন প্রামাণিক তাঁর একমাত্র সন্তানকে কাঠগড়ায় দেখে সব ক্ষোভ ভুলে আবার কাছে টেনে নেন। অন্যদিকে, পুত্র নয়নও আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের ভুল ও অন্যায় উপলব্ধি করতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং ভবিষ্যতে পিতার ভরণপোষণ, নিয়মিত খোঁজখবর ও সন্তানের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
উভয়ের মধ্যে এই পারিবারিক আপোষ ও মানবিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আদালত আসামির জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর পিতা ও পুত্রের মধ্যে আদালতে একটি লিখিত আপোষনামা স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে দীর্ঘ দূরত্বের অবসান ঘটিয়ে আবার একসঙ্গে পথচলা শুরু করেন এই পিতা-পুত্র।
আরও পড়ুন : দ্রুত বিচার বনাম ন্যায়বিচার: রামিসা-আছিয়াদের বিচার কেন অধরা থেকে যায়
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বরাতে জানা গেছে, পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের ষাটগাছা গ্রামের বাসিন্দা তসীমউদ্দীন প্রামাণিক। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একমাত্র সন্তান নয়নকে নিয়েই ছিল তাঁর ছোট পরিবার। কিন্তু পারিবারিক বিরোধের জেরে ছেলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে দিশাহারা হয়ে পড়েন এই বৃদ্ধ। মালিগাছা ইউনিয়নের খন্দকার পাড়ার রেজাউল ও তাঁর স্ত্রী আকলিমা মানবিক কারণে বৃদ্ধ তসীমউদ্দীনকে নিজেদের ছোট ঘরে আশ্রয় দেন।
তসীমউদ্দীন প্রামাণিক অশ্রুভেজা চোখে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, “তোমরা দয়া করে আমাকে বাঁচাও, ছাওয়াল আমার বলে তোমার যেন এই সীমানায় না দেখি।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম, প্রতিবেশী রোমজান আলী এবং যুবক আকমল হোসেনসহ সচেতন মহল এই অমানবিক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ওই ছেলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও বৃদ্ধের ভরণপোষণের দাবি তুলেছিলেন। পাশাপাশি পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আবদুল কাদেরও বৃদ্ধের জন্য সব ধরনের সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের তৎপরতা এবং পাবনা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সময়োচিত আইনি হস্তক্ষেপের কারণে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১০৪ বছরের বৃদ্ধ পিতা তাঁর নিজের ঘরে ও সন্তানের আশ্রয়ে ফিরে গেলেন। এই আদেশ দেশের বিচার বিভাগের মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে।

