লায়লাতুল ফেরদৌস : বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ১৮৬৭ সালের ঔপনিবেশিক জুয়া আইনটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। সেই শূন্যতা পূরণে এবং অনলাইন জুয়া, অর্থ পাচার ও ক্রীড়াঙ্গনের অপরাধ দমনে সম্প্রতি প্রণীত হয়েছে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’। একজন সচেতন আইনজীবী ও প্রতিকারপ্রার্থীর আইনি সহায়তাকারী হিসেবে এই নতুন আইনের ইতিবাচক দিক, সমালোচনা, অপরাধের পরিধি এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো নিবিড়ভাবে জানা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
আইনটির ইতিবাচক দিকসমূহ
১. ঔপনিবেশিক আইনের অবসান ও আধুনিকায়ন: দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ১৮৬৭ সালের পুরোনো আইনটি অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল ক্যাসিনোর মতো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় অকার্যকর ছিল। নতুন আইন সেই দীর্ঘদিনের আইনি শূন্যতা পূরণের সফল চেষ্টা করেছে।
২. অপরাধের বিস্তৃত ও যুগোপযোগী সংজ্ঞা: অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভিপিএন (VPN) ব্যবহার, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ লেনদেনসহ অধিকাংশ আধুনিক ডিজিটাল জুয়া কার্যক্রমকে এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
৩. অর্থ পাচার প্রতিরোধের সঙ্গে সমন্বয়: জুয়া থেকে অর্জিত অবৈধ অর্থ ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং (MFS), হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বৈধ করার প্রচেষ্টাকে সরাসরি ‘অর্থ পাচারের অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যা দেশের সংগঠিত আর্থিক অপরাধ দমনে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
৪. ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের আধুনিক সুযোগ: অপরাধী সনাক্তকরণ ও তদন্ত প্রক্রিয়া সুসংহত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন (DPI), ডেটা অ্যানালিটিক্স ও ট্রানজেকশন মনিটরিং ব্যবহারের আইনগত বিধান রাখা হয়েছে, যা ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহকে আরও কার্যকর করবে।
আইনটির সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা
১. সংজ্ঞার অতিরিক্ত বিস্তৃতি ও অস্পষ্টতা: যদিও অপরাধের সংজ্ঞাগুলো বিস্তারিত, তবুও কিছু শব্দের সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। যেমন—জুয়া প্রচার, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, রেফারেল ক্যাম্পেইন বা ডিজিটাল প্রচারণা কোন পর্যায়ে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, তার স্পষ্ট মানদণ্ড আইনেই উল্লেখ থাকা উচিত ছিল। এতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
২. অপরাধীর ভূমিকার তারতম্য অস্পষ্ট: আইনটি মূল পরিচালনাকারী, সংগঠক, অর্থদাতা, প্রযুক্তিগত সহযোগী, বিজ্ঞাপনদাতা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীর (ইউজার) মধ্যে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সুস্পষ্ট পার্থক্য করেনি। ফলে তুলনামূলক ছোট বা পরোক্ষ ভূমিকায় থাকা ব্যক্তিও কঠোর শাস্তির সমান ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
৩. ‘Sentencing Guideline’ বা সাজা নির্দেশিকার অভাব: একই অপরাধে সর্বোচ্চ সাজা নির্ধারণ করা হলেও কোন পরিস্থিতিতে সর্বনিম্ন সাজা কত হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশিকা নেই। এতে একই ধরনের অপরাধে ভিন্ন ভিন্ন আদালতে বিচারকের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন শাস্তি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
৪. প্রথমবার ও অভ্যাসগত অপরাধীর সমমূল্যায়ন: আইনে প্রথমবার ভুলবশত বা প্রলোভনে পড়ে জুয়ায় জড়ানো ব্যক্তি এবং দীর্ঘদিনের পেশাদার সংঘবদ্ধ অপরাধীকে আলাদা করে দেখার নীতি স্পষ্ট নয়। আধুনিক ফৌজদারি আইন ও অপরাধবিজ্ঞান সাধারণত এই পার্থক্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।
৫. পুনর্বাসন ও চিকিৎসার ব্যবস্থার অনুপস্থিতি: জুয়ার আসক্তি বা ‘Gambling Addiction’ অনেক ক্ষেত্রে একটি গুরুতর মানসিক ও আচরণগত সমস্যা। কিন্তু এই আইনে আসক্তদের জন্য কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন বা চিকিৎসার কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে আইনটি মূলত শাস্তিমুখী হলেও এর সংশোধন ও প্রতিরোধমূলক দিকটি দুর্বল।
৬. ডিজিটাল নজরদারির অপব্যবহারের আশঙ্কা: আইন প্রয়োগের স্বার্থে এআই (AI), ডিপিআই (DPI), মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ (Facial Recognition) ও বিভিন্ন ডেটাবেস ব্যবহারের অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হলেও, নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (Right to Privacy) রক্ষার জন্য কোনো স্বাধীন তদারকি বা জবাবদিহিতার কাঠামো স্পষ্ট করা হয়নি।
অপরাধে সহায়তাকারী ও সহযোগীদের দায়
নতুন আইনটি শুধু মূল জুয়া পরিচালনাকারীকেই নয়, বরং এর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত বিভিন্ন সহযোগীকেও কঠোর শাস্তির আওতায় এনেছে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন:
-
জুয়ার ওয়েবসাইট বা অ্যাপ পরিচালনাকারী ও এডমিন।
-
বুকমেকার এবং বাজি ধরার মধ্যস্থতাকারী।
-
ভিপিএন (VPN) বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনাকারী।
-
ভুয়া সিম বা অন্যের এনআইডি (NID) ব্যবহারকারী।
-
জুয়াভিত্তিক অর্থ পাচারে (Money Laundering) সহায়তাকারী।
-
বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার মাধ্যমে জুয়া প্রসারে জড়িত ব্যক্তি।
পর্যবেক্ষণ: তবে এই ধারায় প্রযুক্তিগত সেবা প্রদানকারী, হোস্টিং কোম্পানি বা ইন্টারনেট সেবাদাতাদের (ISP) দায় ও সুরক্ষার পরিধি কতটুকু হবে, তা আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা যেত।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ইনফ্লুয়েন্সার ও খেলোয়াড়দের আইনি পরিণতি
এটি এই আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর একটি দিক। যদি কোনো—ইউটিউবার, ফেসবুক কনটেন্ট ক্রিয়েটর, টিকটকার, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, ক্রীড়াবিদ, গণমাধ্যম বা অন্য কোনো ব্যক্তি বিজ্ঞাপন, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট লিংক, রেফারেল কোড বা অন্য কোনো উপায়ে জুয়ার অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের প্রচার করেন, তবে তার জন্য নির্ধারিত সাজা:
-
সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড, ৫০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।
অর্থাৎ, আধুনিক আইনি কাঠামোয় শুধু জুয়া খেলা বা পরিচালনা করাই নয়, জুয়ার ডিজিটাল প্রচার-প্রসার করাও এখন একটি গুরুতর ও অউদ্ধারযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।
ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিং নিয়ে আইনি বিধান
ক্রীড়াঙ্গনের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এই আইনে ফিক্সিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর সাজার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে:
-
ম্যাচ ফিক্সিং (Match Fixing): সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা জরিমানা।
-
স্পট ফিক্সিং (Spot Fixing): সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানা।
অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা: আদালত অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় বা ব্যক্তিকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে যেকোনো খেলায় অংশগ্রহণ করা থেকে নিষিদ্ধ করতে পারবেন।
জামিন, আমলযোগ্যতা ও আপস-মীমাংসার বিধান
আইন প্রয়োগকে শতভাগ কঠোর করতে এই আইনের অধীন সংঘটিত সকল অপরাধকে নিচের কাঠামোয় ফেলা হয়েছে:
-
সব অপরাধ আমলযোগ্য (Cognizable): পুলিশ কোনো ওয়ারেন্ট বা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়াই সরাসরি অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারবে।
-
সব অপরাধ অজামিনযোগ্য (Non-Bailable): থানা বা আদালত থেকে সহজেই জামিন পাওয়ার আইনি সুযোগ রাখা হয়নি।
-
সব অপরাধ আপস অযোগ্য (Non-Compoundable): মামলার পক্ষগুলোর পারস্পরিক আপস বা সমঝোতার ভিত্তিতে মামলা নিষ্পত্তির কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
বাস্তবায়নে সম্ভাব্য আইনি ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জসমূহ
১. বিদেশি ওয়েবসাইটের এক্সেস নিয়ন্ত্রণ: যেহেতু অধিকাংশ জুয়ার মূল প্ল্যাটফর্ম ও সার্ভার বিদেশ থেকে পরিচালিত হয়, তাই শুধু দেশীয় আইন বা লোকাল ব্লক দিয়ে তাদের সম্পূর্ণ রুদ্ধ করা বা মূল হোতাদের আইনের মুখোমুখি করা বেশ কঠিন।
২. ভিপিএন ও নতুন প্রযুক্তির ছদ্মবেশ: প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, অপরাধীরাও তত নতুন কৌশল বা এনক্রিপশন ব্যবহার করছে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়মিতভাবে আপগ্রেড না করলে এর সুফল পাওয়া যাবে না।
৩. ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্র্যাকিং জটিলতা: ব্লকচেইন প্রযুক্তির বিকেন্দ্রীভূত বৈশিষ্ট্যের কারণে সব ধরনের ক্রিপ্টো লেনদেন এবং এর প্রকৃত প্রেরক-প্রাপককে শনাক্ত করা এখনও প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল।
৪. আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অপরিহার্যতা: বিদেশি সার্ভার, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে এবং সীমান্তপারের (Cross-border) সাইবার অপরাধ দমনে বিভিন্ন দেশের সাথে পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা (MLA) চুক্তি ছাড়া এই আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
পরিশেষে
আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ, ম্যাচ ফিক্সিং প্রতিরোধ, অর্থ পাচার রোধ ও ডিজিটাল নজরদারির যে বৈশ্বিক প্রবণতা, সে দিক থেকে বাংলাদেশের এই আইনটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে এর সফল প্রয়োগ নির্ভর করবে এর অপব্যবহার রোধ এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের ওপর।
লেখক : লিগ্যাল অ্যাডভাইস অফিসার, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর।

