আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থিত আইনজীবীদের নিয়ে ১৫ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন এবং দেশের অন্তত ২৩টি বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে ৩০০-এর বেশি আইনজীবীকে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বিরত রাখার অভিযোগে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিশ্বের ১৬টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আইনজীবী সংগঠন। একই সঙ্গে সংগঠনগুলো মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমাদানে বাধা, প্রার্থিতা বাতিল, ভীতি প্রদর্শন, হুমকি, সহিংসতা, পুলিশি হয়রানি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) প্যারিস, ব্রাসেলস, দ্য হেগ, বার্লিন, জেনেভা, রোম, বোর্দো, ক্যানবেরা, ভিলনিয়াস, বারাণসী ও আস্তানা থেকে একযোগে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনগুলো বলেছে, এসব ঘটনা নিছক প্রশাসনিক অনিয়ম বা political বিরোধ নয়; বরং আইনজীবী পেশার স্বাধীনতা, আইনের শাসন, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বশাসনের ওপর একটি পদ্ধতিগত আক্রমণ।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ২৩টি বারে ৩০০ আইনজীবীকে বাধার বিবরণ
যৌথ বিবৃতিতে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর থেকে বাংলাদেশজুড়ে বিভিন্ন বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত বা বিবেচিত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আগ্রহী আইনজীবীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাধা, বঞ্চনা ও ভীতি প্রদর্শনের শিকার হচ্ছেন।
জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) কর্তৃক স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তথ্যের বরাত দিয়ে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, দেশের অন্তত ২৩টি বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে ৩০০-এর বেশি আইনজীবীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে— বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, খুলনা, গাজীপুর, বরিশাল, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, দিনাজপুর, নওগাঁ, ঝালকাঠি, পঞ্চগড়, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, মেহেরপুর, পটুয়াখালী ও ঠাকুরগাঁওয়ের বার অ্যাসোসিয়েশন।
যৌথ বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে, বিভিন্ন বার নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক মনোনয়নপত্র দিতে অস্বীকৃতি, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ বা জমাদানে বাধা, স্বেচ্ছাচারীভাবে প্রার্থিতা বাতিল, শারীরিক ভীতি প্রদর্শন, হুমকি, সহিংসতা, পুলিশি হয়রানি ও জবরদস্তির ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, আইনজীবীদের পেশাজীবী সংগঠনের পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বিরত রাখতে পরিকল্পিতভাবে একটি ভীতিকর ও প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে।
বিভিন্ন বারের সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও সহিংসতার খতিয়ান
বিবৃতিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সুনির্দিষ্ট চিত্র তুলে ধরা হয়েছে:
-
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার: সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে ৪২ জন আইনজীবীকে ‘ফ্যাসিবাদের সহযোগী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।
-
ময়মনসিংহ ও মুন্সীগঞ্জ: ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতিতে ১৬ জন এবং মুন্সীগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে ১১ জন আইনজীবীর প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।
-
ঢাকা, চট্টগ্রাম, শরীয়তপুর, বরিশাল ও জামালপুর: ঢাকা আইনজীবী সমিতির ২৩টি কার্যনির্বাহী পদ, চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির ২১টি পদ এবং শরীয়তপুর, বরিশাল ও জামালপুর আইনজীবী সমিতির ১৫টি পদে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বা স্বতন্ত্র কোনো আইনজীবীকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সুযোগই দেওয়া হয়নি।
-
গাজীপুর: গাজীপুরে ১৬টি কার্যনির্বাহী পদের জন্য ৩৯ জন আইনজীবী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে চাইলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁদের মনোনয়নপত্র দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান।
-
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে ২১টি কার্যনির্বাহী পদের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে যাওয়া আইনজীবীরা রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর বাধার মুখে পড়েন। পরিস্থিতির একপর্যায়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁর কার্যালয়ের দরজা বন্ধ করে দেন।
-
ঠাকুরগাঁও ও শরীয়তপুর: ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনের আগে গভীর রাতে পুলিশ কর্মকর্তারা একজন সভাপতি পদপ্রার্থীর বাসভবনে গিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিয়েছেন। অন্যদিকে, শরীয়তপুরে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় একজন আইনজীবী শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন।
-
কুমিল্লা: কুমিল্লায় স্থানীয় একজন সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া সম্ভব হলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা নির্বাচনী প্রচারণায় মারাত্মক বাধা দিয়েছেন।
-
অন্যান্য জেলাসমূহ: রাজশাহী, খুলনা, নওগাঁ, ঝালকাঠি, মানিকগঞ্জ, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, শেরপুর, টাঙ্গাইল, মেহেরপুর, পটুয়াখালী ও চাঁদপুরে নির্বিচার গ্রেপ্তার, ফৌজদারি মামলায় জড়ানোর হুমকি, সংঘবদ্ধ সহিংসতার হুমকি এবং অন্যান্য ধরনের ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ বিবৃতিতে আনা হয়েছে।
বার কাউন্সিলের অ্যাডহক কমিটি ও দেশব্যাপী ব্যাপক দমন-পীড়ন
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পরিচালনার জন্য গঠিত ১৫ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ৩০ জুন কর্তৃপক্ষ দেশের আইনজীবী পেশা নিয়ন্ত্রণকারী সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পরিচালনার জন্য ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদে ১৫ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে।
সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই কমিটিটি একচেতিয়াভাবে বিএনপিপন্থী ও জামায়াত-সমর্থিত আইনজীবীদের নিয়ে গঠিত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত পেশাজীবী সংগঠন পরিচালনার গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী এবং আইনজীবী পেশার স্বাধীনতা ও প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্রকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে।
জেএমবিএফ-এর তথ্যের বরাত দিয়ে বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৬৮টি ঘটনায় ৮৪৯ জন আইনজীবীর ওপর দমন-পীড়নের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে নির্বিচার গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড রয়েছে, যা আইনজীবীদের ভূমিকা সম্পর্কিত জাতিসংঘের মৌলিক নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
আন্তর্জাতিক মহলের ৮ দফা দাবি ও আহ্বান
বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকার, আইনজীবী সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি নিম্নোক্ত আট দফা আহ্বান জানানো হয়েছে:
১. বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অ্যাডহক কমিটি গঠনের আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা।
২. গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ, অনিয়মিত ও বৈষম্যমূলক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এবং সংশ্লিষ্ট জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের কমিটি বাতিল করা।
৩. বার কাউন্সিল ও বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোতে অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং বেআইনিভাবে বাতিল করা সব প্রার্থিতা পুনর্বহাল করা।
৪. আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শন, হয়রানি, নির্বিচার গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, নজরদারি, জবরদস্তি ও সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করা।
৫. বার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা, স্বেচ্ছাচারী বঞ্চনা এবং নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগের দ্রুত, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
৬. আইনজীবী পেশার স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন ও স্বশাসনের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বার কাউন্সিল ও বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোর প্রশাসন, পরিচালনা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা।
৭. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বার অ্যাসোসিয়েশন, ল’সোসাইটি এবং আইন ও বিচারবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশের আইনজীবী পেশার স্বাধীনতার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং অধিকার লঙ্ঘনের শিকার আইনজীবীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা।
৮. জাতিসংঘের মানবাধিকার ব্যবস্থাসমূহ, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়, বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতাবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাকে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া।
বিবৃতিতে পরিশেষে বলা হয়, আইনজীবী পেশার স্বাধীনতা গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষার অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ। আইনজীবীদের নীরব করা, ভীতি প্রদর্শন করা বা রাজনৈতিক কারণে বৈষম্যের শিকার করার প্রচেষ্টা সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে বিপন্ন করে।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ১৬টি আন্তর্জাতিক সংগঠন:
১. কাউন্সিল অব বার্স অ্যান্ড ল’সোসাইটিজ অব ইউরোপ (CCBE) ২. জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (JMBF) ৩. ইন্টারন্যাশনাল অবজারভেটরি অব লইয়ার্স অ্যাট RISK (OIAD) ৪. ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল বার কাউন্সিল (CNB) ৫. জার্মান ফেডারেল বার (BRAK) ৬. ইতালিয়ান ন্যাশনাল বার কাউন্সিল (CNF) ৭. ফাউন্ডেশন ডে অব দ্য এনডেঞ্জার্ড লইয়ার ৮. জেনেভা বার অ্যাসোসিয়েশন ৯. জার্মান বার অ্যাসোসিয়েশন (DAV) ১০. প্যারিস বার ১১. ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব পিপলস লইয়ার্স (IAPL) ১২. ইন্টারন্যাশনাল লিগ অ্যাগেইনস্ট আরবিট্রারি ডিটেনশন (ILAAD) ১৩. দ্য ল’অ্যাসোসিয়েশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক (LAWASIA) ১৪. পিপলস ভিজিল্যান্স কমিটি অন হিউম্যান রাইটস (PVCHR) ১৫. বেলারুশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব হিউম্যান রাইটস লইয়ার্স ১৬. পাবলিক অ্যাসোসিয়েশন ‘ডিগনিটি’।
জানা গেছে, এই যৌথ বিবৃতিটি সংগঠনগুলোর নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এবং জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের কাছে ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে।

