মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী, কক্সবাজার প্রতিনিধি | কক্সবাজারে বেড়াতে আসা এক অস্ট্রেলিয়ান নারী পর্যটককে কটেজের জানালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে ধর্ষণের চেষ্টার দায়ে ৩ আসামিকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। অর্থদণ্ড অনাদায়ে প্রত্যেককে আরও এক মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনসহ দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা এই ঘটনার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে গতকাল সোমবার (৬ জুলাই) কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) রোকেয়া আক্তার এই রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের একই ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী মোহাম্মদ শামীম রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দণ্ডিত আসামিরা হলেন— আনছারুল্লাহ (২৪), আবদুল গফুর (২০) এবং বেলাল উদ্দিন (৩০)। তাদের সকলের বাড়ি কক্সবাজারের রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের পেঁচারদ্বীপ গ্রামে।
রায় ঘোষণার সময় দণ্ডিত আসামিরা সকলে পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষে একই ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মীর মোশাররফ হোসেন টিটু মামলাটি সফলভাবে পরিচালনা করেন।
রায়ে কাইমুল হক চৌধুরী শামীম নামক একজন আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়েছে।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণী থেকে জানা যায়, অস্ট্রেলিয়ান নারী পর্যটক মিস এলেসা ব্রুক এলিয়ট (Miss. Elesha Brooke Eillot) কক্সবাজারে ভ্রমণ করতে এসে রামু উপজেলার পেঁচারদ্বীপ মেরিন ড্রাইভ রোড সংলগ্ন ‘গুড ভাইবস কটেজ’ (Good Vibes Cottage)-এ অবস্থান করছিলেন। ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ১টা থেকে ১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে মিস এলেসা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, তখন ৩/৪ জন দুর্বৃত্ত কটেজের জানালার গ্রিল ও গ্লাস ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।
তারা ঘরে ঢুকে ওই বিদেশি নাগরিককে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। এ সময় এলেসা ব্রুক এলিয়ট আত্মরক্ষার্থে চিৎকার শুরু করলে কটেজের আশপাশের লোকজন ও নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতির আশঙ্কায় দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ কল করলে রামু থানার হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে রক্তাক্ত ও আহত অবস্থায় উদ্ধার করে এবং কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করে।
বিদেশি নারী পর্যটকের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় তৎকালীন সময়ে ঢাকায় নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনারের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করে। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভিকটিমের জবানবন্দী আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করা হয়। ঘটনা তদন্তে নেমে পুলিশ দ্রুত জড়িত কটেজের কেয়ারটেকার আনছারুল্লাহ ও আবদুল গফুরকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও আইনি ধারা
এই নজিরবিহীন জঘন্য ঘটনায় রামু থানার হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির এসআই স্বরূপ কান্তি পাল বাদী হয়ে রামু থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করেন (যার নারী মামলা নম্বর: ৭২/২০২১ ইংরেজি)। পরবর্তীতে মামলাটি বিচারের জন্য কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ আদালতে স্থানান্তরিত হয় এবং আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ (অভিযোগ) গঠন করে বিচারকার্য শুরু করা হয়।
আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীন আদালতে মোট ৬ জন সাক্ষীর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য গ্রহণ, মামলার আলামত প্রদর্শন, ভিকটিমের মেডিকেল রিপোর্ট পর্যালোচনা, সাক্ষীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক (Arguments) শ্রবণসহ বিচারের সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আদালত গতকাল সোমবার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।
ধার্যকৃত দিনে বিচারক রোকেয়া আক্তার ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৪)(খ)/৩০ ধারার বিধান অনুযায়ী আসামিদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের এই কঠোর দণ্ডাদেশ প্রদান করেন। রায়ের মাধ্যমে কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো বলে মনে করছেন কক্সবাজার জেলা বারের আইনজীবীরা।

