বিচারপতি এ এফ এম আবদুর রহমান: কিছু রাজনৈতিক নেতা এবং দেশের কিছু বরেণ্য আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সাথে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত গণভোট ও গণভোটে জাতির প্রদত্ত হ্যাঁ ভোটের বিরুদ্ধ অবস্থান নিয়েছেন। গণতন্ত্রের মূলনীতি পরমতসহিষ্ণুতার নীতি অনুসরণে তাদের অভিমতের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করেও বলতে চাই, তাদের অভিমত অন্তসারশূন্য। এ বিষয়টি আলোচনার জন্য বর্তমান নিবন্ধের অবতারণা।
গণভোট কি? এর বৈধতার ভিত্তি কি? এ প্রশ্নগুলো এখন জাতির সামনে সোচ্চারভাবে বিরাজমান। বিশেষ করে দেশের কিছু বরেণ্য আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে নেতিবাচক মতামত প্রকাশ করায় এবং বিএনপির সংসদ সদস্যগণ জনাব সালাহ উদ্দীনের নেতৃত্বে সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকার করায় গণভোটে জনগণের প্রদত্ত হ্যাঁ ভোটের কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
বিশেষ করে সরকার গঠনকারী দলটির এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় প্রশ্নটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিষয়টি রাজনৈতিক কিংবা দলীয় মতবাদের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ না করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে বিবেচনা করলেই দেশের এসব বরেণ্য আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের এবং বিএনপির সংসদ সদস্য জনাব সালাহ উদ্দীনের বক্তব্য ও পদক্ষেপের অসারতা তুলে ধরা সহজ হবে।
রাষ্ট্র কাঠামোর চারটি মূল অনুসঙ্গ তথা (১) নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, (২) জনগোষ্ঠী, (৩) সরকার এবং (৪) সার্বভৌমত্ব এর মধ্যে সার্বভৌমত্ব এমন একটি অনুসঙ্গ, যার মূল ভিত্তি হচ্ছে অপর কোনো রাষ্ট্রের অধীনতা বিহীন পরিবেশে জনগণের স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার ইচ্ছা। এই ইচ্ছাটি আবার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে। একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ নয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই সার্বভৌমত্ব অপর রাষ্ট্রসমূহ অথবা রাষ্ট্রসমূহের সংঘ দ্বারা স্বীকৃতি লাভ করে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রটিতে রাষ্ট্রের সকল অনুসঙ্গ উপস্থিত থাকলেও এর সার্বভৌমত্বের প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকায় এটি এখনও পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি।
একই নীতিতে একটি প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হতে পারে যদি অপর রাষ্ট্ররা তাদের প্রদত্ত স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে নেয়। এমনকি একক শক্তিধর রাষ্ট্র কর্তৃক একটি দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর যে কোনো ধরনের শক্তি প্রয়োগ এই দুর্বল রাষ্ট্রটির সার্বভৌমত্বকে বিনষ্ট করতে পারে। উদাহরণ আমাদের সামনেই আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে মুহূর্তে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে উঠিয়ে নিয়ে এলেন, সে মুহূর্তে কলম্বিয়ার সার্বভৌমত্ব শুধু ক্ষুণ্ণই হয়নি, বরং সেটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইচ্ছাধীন হয়ে পড়েছে। এখন তিনি কলম্বিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য সকল প্রকার সিদ্ধান্ত প্রদান করছেন। ফলে কলম্বিয়ার জনগণের স্বাধীন থাকার ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ থাকলেও একটি শক্তিধর রাষ্ট্রের ক্রীড়নক হয়ে যাওয়ার কারণে কলম্বিয়া রাষ্ট্রটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র থেকে বহুলাংশে সরে গেছে।
এই কঠিন বাস্তবতা সত্ত্বেও একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নীতিতে জনগণের সর্বোচ্চ ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি। একটি রাষ্ট্রের গঠিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রথমত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর এই ইচ্ছাটি প্রকাশিত হয়। এই ইচ্ছা প্রকাশের পেছনে যে শক্তি কাজ করে সেটি সহজাত শক্তি (Inherent Power)। এটি কোনো আইন বা পূর্ববর্তী কোনো সংবিধান থেকে উৎসারিত শক্তি নয়। রাষ্ট্রের গঠনকারী জনগোষ্ঠীর ঐ সহজাত শক্তিটি কোনোভাবে সীমিত কিংবা শৃঙ্খলিত করা যায় না এবং এটি সবসময় জনগোষ্ঠীর সাথে উন্মুক্তভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে। জনগণই সর্বোচ্চে অবস্থান করে। অবশিষ্ট সবই তার নিম্নে অবস্থান করে।
জনগণের এই সর্বোচ্চ ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ দ্বারা রাষ্ট্র গঠিত হয়ে গেলে ঐ জনগোষ্ঠী নিজ রাষ্ট্রের সুস্থ পরিচালনার উদ্দেশ্যে নীতিমালা তথা সংবিধান প্রণয়ন করে থাকে। সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে জনগণ একটি পরিষদ গঠন করে, সে পরিষদের ওপর এই নীতিমালা তথা সংবিধান তৈরির ক্ষমতা অর্পণ করে। এই পরিষদটি “গণপরিষদ” তথা কনস্টিটিউশনাল অ্যাসেম্বলি (Constitutional Assembly) নামে পরিচিত হয়। এই পরিষদ-প্রস্তাবিত সেই সংবিধানে রাষ্ট্রের পরিচালনার জন্য সরকার গঠনসহ সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা অর্পণের নীতিমালা প্রণয়ন করে।
ফলে ঐ নীতিমালা রাষ্ট্রের পরিচালনার সর্বক্ষেত্রে অনুসৃত হয়। এই নীতিমালা বা সংবিধানে যে সকল বিধান দেওয়া হয়, রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকার সেসব বিধানের বাইরে যেতে পারে না। এটাকেই বলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালার পরিবর্তনের আবশ্যক হলে সেই পরিবর্তনের পদ্ধতিও সেই নীতিমালাতেই বর্ণিত থাকে। এভাবেই একটি রাষ্ট্রের পরিচালনার যাবতীয় বিধিবিধান প্রণীত সংবিধানের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে যায়। রাষ্ট্র পরিচালনায় এই নীতিমালার যেকোনো বিষয়ে বিচ্যুতি ঘটলে সেটি অসাংবিধানিক মর্মে বাতিলযোগ্য হয়।
কিন্তু প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে, জনগণের যে সহজাত ক্ষমতাবলে এই সংবিধান প্রণীত হলো, জনগণের সেই সহজাত ক্ষমতা কি তবে ঐ সংবিধানের চার দেয়ালের ভেতরে আটকে গেল? জনগণ কি সংবিধানের অভ্যন্তরে তাদের এই সহজাত ক্ষমতা বিসর্জন দিল?
আমরা আগেই বলেছি যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নীতি এই বক্তব্যকে সমর্থন করে না। একটি সাধারণ আইনের উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা চলতে পারে। কোনো ব্যক্তি যখন অপর কোনো ব্যক্তিকে আইনানুযায়ী আমমোক্তারনামা (Power of Attorney) প্রদান করে, তখন সে তার আমমোক্তার দেওয়ার অসীম ক্ষমতাকে সীমিত করে না। অ্যাটর্নি নিয়োগ করা সত্ত্বেও আমমোক্তার দাতা প্রয়োজনে প্রার্থিত কাজটি নিজেই সম্পাদন করতে পারেন। তার এই সহজাত ক্ষমতা, প্রদত্ত পাওয়ার অব অ্যাটর্নির চার দেয়ালের মধ্যে হারিয়ে যায় না বা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে না।
বাংলাদেশে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রয়োজনে যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেটির কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই মর্মে দেশের বরেণ্য সংবিধান বিশেষজ্ঞগণ যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন, সেটা সর্বৈব সত্য। এটা যথার্থ যে বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধান সন্নিবেশ নেই।
কিন্তু বিনয়ের সাথে বলতে চাই যে, গণভোটের ক্ষমতা কি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়? বরেণ্য এসব বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের প্রতি পূর্ণ সম্মান রক্ষা করেও আমি বিনীতভাবে তাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করছি যে, গণভোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গণভোটে জনগণের নিজ মতামত ব্যক্ত করার বিষয় না সাংবিধানিক বিষয়, না সেটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত নীতি পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে জনগণের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশরূপে সংবিধান প্রণীত হলেও জনগোষ্ঠীর এই সার্বভৌমত্বের শক্তি সংবিধানের চার দেয়ালের ভেতর বন্দী হয়ে যায় না। জনগণের প্রেক্ষাপটে এই সর্বোচ্চ ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশের শক্তি কোনো কিছু দ্বারা বাধিত করা যায় না। বরং এটি জনগণের এমন একটি উন্মুক্ত সহজাত ক্ষমতারূপে বিরাজমান থাকে, যা জনগণের প্রণীত সংবিধানের অধীনস্থ তো হয়ই না, বরং এটি সব সময় প্রণীত সংবিধানের ওপর, বাইরে বা ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। যে সকল রাষ্ট্রের এইরূপ কোনো লিখিত সংবিধান নেই, সে সকল রাষ্ট্রের এই ক্ষমতা সব সময় সক্রিয় থাকে এবং লিখিত সংবিধানের রাষ্ট্রগুলিতে এই ক্ষমতা জনগণের নিকট সুপ্ত অবস্থায় বিরাজমান থাকে। জনগণ এই সুপ্ত ক্ষমতা প্রয়োজনে যেকোনো সময় ব্যবহার করতে পারে।
বাংলাদেশ তথা ভুতপূর্ব পাকিস্তানের পূর্ব ভূখণ্ডের (পূর্ব পাকিস্তান) সাড়ে সাত কোটি জনগোষ্ঠী তাদের ইচ্ছার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশরূপে পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলাদেশ নামীয় রাষ্ট্রে পরিবর্তিত করেছে এবং নিজেদের রাষ্ট্রের পরিচালনার জন্য একটি গণপরিষদ গঠন করে সেটির মাধ্যমে সংবিধান প্রণয়নপূর্বক সেই সংবিধানটি অধিগ্রহণ করেছে এবং সেটির অধীনে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। এই সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদের (১) উপ-অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের সকল ক্ষমতার নিম্নরূপ ঘোষণা প্রদান করা হয়েছে:
অনুচ্ছেদ ৭: সংবিধানের প্রাধান্য
(১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।
(২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসমঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।
উপরোক্ত অনুচ্ছেদের কারণে আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে জনগণের ক্ষমতা প্রণীত সংবিধানের অধীন করা হয়েছে রূপে ভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি তেমন নয়। এই অনুচ্ছেদেই বলা আছে “জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ” কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে করতে হবে। জনগণের ক্ষমতা প্রয়োগ করে কে? অবশ্যই সরকার। অর্থাৎ জনগণের ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার যার (অর্থাৎ সরকারের), তাকে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হলে এই সংবিধানের ভিত্তিতেই করতে হবে।
এখানে একথা বলা নেই যে “জনগণ যদি তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চায়, তবে জনগণকে এই সংবিধানের ভিত্তিতেই সে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে।” এ স্থলে ক্ষমতার মূল মালিক এবং ক্ষমতার প্রয়োগকারীকে পৃথকভাবে দেখতে হবে এবং এই দুজনকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। জনগণের এই অসীম সহজাত ক্ষমতা লিখিত একটি সংবিধান নামীয় পুস্তকের মধ্যে বন্দী করা যায় না। জনগণের সহজাত ক্ষমতার বন্দীত্ব নীতি যারা প্রচার করতে চান, তারা প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূল নীতিটি অস্বীকার করতে চান।
জনগণের সহজাত ক্ষমতা সম্পর্কে জন অস্টিন যথার্থই বলেছেন,
Sovereignty is vested in a determinate body like Parliament, the broader political view (associated with thinkers like Rousseau) is that sovereignty belongs to the general will of the people. The people are considered the constituent power, the entity that authorizes the constitutional arrangements and can legally alter or abolish a government that has become tyrannical.
আন্তর্জাতিক এই আইনজ্ঞদের অভিমতের সাথে একমত হয়ে বলতে চাই, গণভোট করার সিদ্ধান্ত ও গণভোটে নিজ মতামত ব্যক্ত করার এই সহজাত ক্ষমতা বাংলাদেশের সংবিধানের বিষয় নয় এবং এই ক্ষমতা উন্মুক্ত সহজাত ক্ষমতা হিসেবে সব সময় বাংলাদেশের জনগণের কাছে সুপ্তভাবে আছে এবং সেটি সংবিধান উর্ধ্ব বিষয়।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তির এই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ তথা জনগণের এই সহজাত ক্ষমতার ধারক ও বাহক হিসেবে কি গণভোটের সিদ্ধান্ত নিতে পারে?
উত্তরটি হ্যাঁবাচক।
বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অংশগ্রহণে সংঘটিত একটি রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী যুবকরা সমগ্র জাতির পক্ষে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে, সে সরকারকে (১) দেশ পরিচালনার ও (২) রাষ্ট্র মেরামতের দায়িত্ব প্রদান করে। এই বিপ্লব এবং বিপ্লবের ফলশ্রুতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন, কাজ দুটি বাংলাদেশের সংবিধানের কোনো বিধানের ভিত্তিতে সংঘটিত হয়নি, কিংবা হওয়ার কোনো বিধানও সংবিধানে ছিল না।
প্রকৃতপক্ষে এ দুটি কার্য সংঘটিত হয়েছে জনগণের সহজাত ক্ষমতাবলে। জনগণের সহজাত ক্ষমতাবলে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হওয়ার সাথে সাথে বিপ্লব সংঘটনকারী জনগণের সহজাত ক্ষমতা এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে অর্পিত হয়ে যায় এবং সে কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের সহজাত ক্ষমতার ধারক ও বাহকে পরিণত হয়। এই অভূতপূর্ব ক্ষমতায় বলীয়ান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি সংক্রান্তে দুটি অপশন ছিল, হয় (১) বিপ্লবী পরিষদ গঠন করে বিপ্লবী পরিষদের ফরমান জারি করে সেই ফরমানের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের পরিচালনা করা, কিংবা (২) প্রচলিত সংবিধান অধিগ্রহণ করে সংবিধানের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা।
জনগণের সহজাত ক্ষমতাবলে নির্দিষ্ট কার্যক্রম প্রদান করে গঠিত হওয়ার কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব ছিল (১) একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করা ও পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা এবং (২) বিপ্লবের উদ্দেশ্য পূরণে রাষ্ট্রের মেরামত তথা সংস্কার সাধন করা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের সহজাত ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে বাংলাদেশ নামীয় রাষ্ট্রের পরিচালনার জন্য সংবিধানের বিধিবিধান গ্রহণ করলেন এবং এই বিধিবিধান অনুযায়ী প্রায় দুই বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করলেন এবং সংস্কার কার্যক্রমের জন্য জুলাই ঘোষণা এবং জাতীয় জুলাই সনদ প্রণয়ন করে সহজাত ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে এ দুটি দলিলের বৈধতা প্রদানের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত করলেন।
নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের ২০২৪-২৫ এর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্বিতীয় অপশনটি গ্রহণ করে রাষ্ট্রের পরিচালনা করলেও রাষ্ট্র মেরামত বা বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম করার পেছনের শক্তিটি ছিল জনগণের সহজাত ক্ষমতা। এতে বিপ্লবের চরিত্র ও চেতনার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। এই দুই বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রণীত সকল আইন ও ঐ সকল আইনের অধীনে কৃত কার্যক্রম রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নীতিতে সম্পূর্ণরূপে বৈধ বলেই বিবেচিত।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অতঃপর জনগণের সহজাত ক্ষমতা বলে ৫ আগস্টের বিপ্লবকে নিরঙ্কুশ করতে জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদের বৈধতা সংক্রান্তে যে গণভোট অনুষ্ঠিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন এবং তা বাস্তবায়ন করলেন, সেটিও সহজাত ক্ষমতাবলে সংঘটিত হওয়ায় সেটিও সর্বৈব বৈধরূপেই বিবেচিত। ফলে রাষ্ট্রের পরিচালনা এবং গণভোটের বৈধতা সংক্রান্তে কোনো রূপ প্রশ্ন উত্থাপন করা সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত।
দেশের বরেণ্য সংবিধান বিশেষজ্ঞগণ জনগণের সহজাত ক্ষমতা এবং এই সহজাত ক্ষমতার অধীনে প্রণীত সাংবিধানিক ক্ষমতাকে গুলিয়ে ফেলেছেন এবং ভ্রান্ত অভিমত ব্যক্ত করছেন যে সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধান না থাকায় গণভোট অনুষ্ঠিত করা অবৈধ। এই অভিমত অন্তসারশূন্য এবং এর দ্বারা জনগণের পরম অভিব্যক্তির কোনো অন্যথা সংঘটিত হবে না।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

