চন্দন কান্তি নাথ
চন্দন কান্তি নাথ

যেভাবে এবং যা দিয়ে রামিসা বা অন্য শিশু হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের বিচার দ্রুত হবে

চন্দন কান্তি নাথ : বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভ ও ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকার এবং ৩৫ অনুচ্ছেদ মতে আসামির বিচার দ্রুত করার কথা আছে। তাই ভিকটিম রামিসার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার সংবিধানের অনুপ্রেরণায় ও বিধানে এবং দেশের প্রচলিত আইনে অবশ্যই দ্রুত করা সম্ভব।

তবে বিচারের আগে আসে তদন্তের প্রশ্ন। ১৮৯৮ সনের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ (১) ধারা মোতাবেক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শেষ করার কথা। পিআরবির ২৬১ (সি) প্রবিধান অনুসারে যত কঠিন মামলা হোক না কেন, তা ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান লিপিবদ্ধ আছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭২ ধারা মোতাবেক পুলিশ তার প্রতিদিনের কার্যক্রম কেস ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করতে বাধ্য। ১৭৩ ধারা মোতাবেক কোনো অপ্রয়োজনীয় দেরি পুলিশ করতে পারবে না। তবে ভিক্টিম রামিসা হত্যা কান্ডের বিচার নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের অধীন গঠিত একটি আদালত শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইবুনালের হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৮ ধারায় আছে, ফৌজদারি কার্যবিধিতে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, উক্ত আইনের অধীন কোনো অপরাধের তদন্ত—

(ক) অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ সংঘটনের সময়ে হাতেনাতে পুলিশ কর্তৃক ধৃত হইলে বা অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ধৃত হইয়া পুলিশের নিকট সোপর্দ হইলে, তাহার ধৃত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী পনেরো কার্য দিবসের মধ্যে সম্পন্ন করিতে হইবে; অথবা

(খ) অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ সংঘটনের সময়ে হাতেনাতে ধৃত না হইলে তাহার অপরাধ সংঘটন সংক্রান্ত প্রাথমিক তথ্য প্রাপ্তি বা, ক্ষেত্রমতে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা তাহার নিকট হইতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অথবা ট্রাইব্যুনালের নিকট হইতে তদন্তের আদেশ প্রাপ্তির তারিখ হইতে পরবর্তী ৩০ (ত্রিশ) কার্য দিবসের মধ্যে সম্পন্ন করিতে হইবে।

যেহেতু মামলার মধ্যে একজন আসামি হাতেনাতে ধৃত এবং একজন আসামি পলাতক আছে এবং পরে দ্রুত ধৃত হয়, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই ১৫ দিনের ভেতরে অথবা ৩০ দিনের ভেতরে তদন্ত শেষ করতে হবে। একটি কথা এখানে গুরুত্বপূর্ণ যে, মামলার তদন্ত ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে এর অর্থ ফৌজদারি কার্যবিধি ও সংশ্লিষ্ট আইন অনুসারে মামলাটি ২৪ ঘণ্টায় অথবা ৭ দিনের ভেতরেও তদন্ত শেষ করতে পারা যায়। পুলিশ নির্দিষ্ট সময়ে তদন্ত শেষ করতে না পারলে উক্ত আইন, ফৌজদারি কার্যবিধি, পুলিশ আইন, পিআরবি ও অন্যান্য ফৌজদারি আইন অনুসারে সংশ্লিষ্ট আমল গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা সংশ্লিষ্ট আদালত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন এবং তদন্ত কর্মকর্তার কাছে কৈফিয়ত তলব করতে পারবেন।

তবে মামলার তদন্তে দ্রুত সাক্ষ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করা অপরিহার্য। প্রথমেই আসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ ও অন্যান্য ফৌজদারি আইন অনুসারে মৃত্যুর সঠিক কারণ, ধর্ষণের আলামত এবং মৃত্যুর সময় নির্ধারণে ফরেনসিক ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহের কথা। তারপর আসে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী কর্তৃক আদালতে ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে স্বেচ্ছায় দেওয়া ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আসামির জবানবন্দি। এরপর ধর্ষণের অভিযোগ ও লাশের বিকৃতি প্রমাণের জন্য সিআইডি (CID) ল্যাবে ডিএনএ (DNA) এবং কেমিক্যাল পরীক্ষা করা যায়। এরপর আসামির কথামতো উদ্ধারকৃত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র (ছুরি), বিচ্ছিন্ন মাথা ও দেহাংশ উদ্ধারের জব্দ তালিকা তদন্তকারী কর্মকর্তা সঠিকভাবে করবেন এবং যদি সম্ভব হয় ঘটনাস্থলের ফরেনসিক রিপোর্টও তিনি সংগ্রহ করবেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে রামিসার মা, উদ্ধারকারী স্থানীয় জনতা এবং ভবনের অন্য ভাড়াটিয়াদের দেওয়া সাক্ষ্যসহ সমস্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য তদন্তকারী দ্রুত সংগ্রহ করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় লিপিবদ্ধ করবেন। সঙ্গে আদালতে উপস্থিতির জন্য পিআর বন্ডেও স্বাক্ষর নিয়ে রাখবেন। পুলিশের ক্ষেত্রে বিপি নং ও মোবাইল নং এবং অন্যদের ক্ষেত্রে মোবাইল নং সংগ্রহ করে রাখবেন। আবার আসামির পালিয়ে যাওয়ার সময়ের কল রেকর্ড, অবস্থান শনাক্তের (Location tracking) ডেটা এবং সিসিটিভি ফুটেজ, যা পলাতক অবস্থায় তাকে গ্রেফতারে সহায়তা করেছে ইত্যাদিও দ্রুত সংগ্রহ করবেন। ২০২২ সালের সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর সংশোধনী অনুসারে বর্তমানে ডিজিটাল সাক্ষ্যকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য করা হয়।

বর্তমান সাক্ষ্য আইনে রক্ত, বীর্য, চুল, শরীরের সমস্ত উপাদান, অঙ্গ বা অঙ্গের অংশ, ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ), আঙুলের ছাপ, হাতের তালুর ছাপ, চোখের তারার ছাপ এবং পায়ের ছাপ বা অন্য কোনো অনুরূপ উপাদান বা বস্তু যা— (i) কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা প্রমাণ করতে পারে অথবা কোনো অপরাধ ও তার ভুক্তভোগীর মধ্যে কিংবা কোনো অপরাধ ও তার অপরাধীর মধ্যে যোগসূত্র বা সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে; এবং (ii) কোনো ঘটনা প্রমাণ বা অপ্রমাণ করতে পারে; এই ধরনের উপাদান বা বস্তুসমূহকে ভৌত বা ফরেনসিক প্রমাণ বলা হয়, যা বর্তমানে অভেদ্য প্রমাণ ও প্রাসঙ্গিক হিসেবে গণ্য করা যায়।

দ্বিতীয়ত আসে মামলার বিচার। ২৪ ঘণ্টায় এই মামলায় তদন্ত শেষ না হলেও সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিক হলে ৭ দিনে অথবা ১৫ দিনে অবশ্যই তদন্ত শেষ করা যায়। সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা আদালত তদন্ত দ্রুত করার জন্য বলতে পারেন। আর একবার তদন্ত শুরু হলে প্রতিদিন তদন্ত করার কথা আইনে আছে। ফৌজদারি বিধি ও আদেশ (Criminal Rules and Order, 2009)-এর ৭৫(২) বিধিতে আছে— The Magistrate shall impress the investigation officer to complete the investigation as expeditiously as possible.

তদন্ত শেষ হওয়ার পর আইনে দ্রুত বিচারের কথা আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০(২) ধারায় আছে, “ট্রাইব্যুনালে মামলার শুনানি শুরু হইলে উহা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা চলিবে।” সিআরআরও, ২০০৯-তেও একইরূপ বিধান আছে। তবে অবশ্যই সাক্ষী হাজির করার দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া হয়েছে বিধায় পুলিশকে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৭১(২) মোতাবেক সব সাক্ষী একদিনে বা প্রতিদিনে হাজির করতে হবে। এমনকি উক্ত আইনের ২০(৯) ধারায় আছে, “এই আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কেবল ধর্ষণের মামলার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল উপযুক্ত বিবেচনা করিলে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করিয়া বিচারকার্য সম্পন্ন করিতে পারিবে।” সাক্ষী হাজির সংক্রান্ত আইনে আছে: “১) এই আইনের অধীন কোনো অপরাধের বিচারের জন্য সাক্ষীর সমন বা ওয়ারেন্ট কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট সাক্ষীর সর্বশেষ বসবাসের ঠিকানা যে থানায় অবস্থিত, সেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট প্রেরণ করিতে হইবে এবং উক্ত সাক্ষীকে উক্ত ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত করিবার দায়িত্ব উক্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার থাকিবে। ২) উপ-ধারা (১) এর বিধান সত্ত্বেও সাক্ষীর সমনের একটি অনুলিপি সংশ্লিষ্ট সাক্ষীকে এবং সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ সুপার বা, ক্ষেত্রমতে, পুলিশ কমিশনারকে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র সমেত নিবন্ধিত ডাকযোগে প্রেরণ করা যাইবে। ৩) এই ধারার অধীন কোনো সমন বা ওয়ারেন্ট কার্যকর করিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃত গাফিলতি করিলে ট্রাইব্যুনাল উহাকে অদক্ষতা হিসাবে চিহ্নিত করিয়া সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্ত নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে। ৪) কোনো ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে কিংবা ট্রাইব্যুনাল স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত মনে করিলে যে কোনো দূরবর্তী সাক্ষীর সাক্ষ্য, এ সম্পর্কিত বলবৎ আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রহণ করিতে পারিবে এবং এতদুদ্দেশ্যে সরকার এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষ ট্রাইব্যুনালকে তথ্যপ্রযুক্তিগত প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করিবে।”

উল্লেখ্য, বাগেরহাটের মাননীয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ আদালতের বিচারক গত ২০২০ সনের ১১ অক্টোবর মামলাটি আমলে নিয়ে পরদিন চার্জ গঠন করেন। ১৩ অক্টোবর বাদী পক্ষের মোট ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ১৪ অক্টোবর মামলার সংশ্লিষ্ট সাক্ষী চিকিৎসক, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, নারী পুলিশ সদস্য এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ১৫ অক্টোবর আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনে সাফাই সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। ১৮ অক্টোবর বিকালে বিচারক দীর্ঘ সময় বাদী ও বিবাদী পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে সোমবার রায়ের দিন ঘোষণা করেন এবং রায় দেন ও ইতিহাস তৈরি করেন।

আরো উল্লেখ্য, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর বিভিন্ন ধারায় তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিচারককে তদন্তে বা বিচারে দেরি করলে তাঁদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়েছে। তাই রামিসার বা অন্য শিশু হত্যাকাণ্ডের ও ধর্ষণের বিচার সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ আইনজীবীসহ সবাই আন্তরিক হলে দ্রুত না হওয়ার কোনো কারণ নেই। সে ক্ষেত্রে দেশের জনগণ এই বিচার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক আগামী এক মাসের মধ্যে সম্পন্ন হতে দেখতে পাবেন। তবে রায় চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্য মহামান্য হাইকোর্টে ও আপিল বিভাগেও স্পেশাল বেঞ্চ গঠন করে বিচারের রায়ের সঠিকতা দ্রুততার সাথে নির্ধারণ করতে হবে এবং পরে রায় কার্যকর করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়গণ যেহেতু নিজে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং মাননীয় আইনমন্ত্রীও বিষয়টি নিয়ে ওয়াকিবহাল, সেহেতু অবশ্যই রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো দ্রুত তাদের দায়িত্ব পালন করবেন আর মাননীয় প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট বিচারকের মাধ্যমে জাতি দ্রুত ন্যায়বিচার দেখতে পারবে।

লেখক: অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, খাগড়াছড়ি।