অ্যাডভোকেট রাশিদা চৌধুরী নীলু
অ্যাডভোকেট রাশিদা চৌধুরী নীলু

প্রতিনিধিত্বহীন বিচার অনেকাংশে অপরাধীকে মুক্তির পথ দেখায়

রাশিদা চৌধুরী নীলু : ধর্ষণ একটি জঘন্য ও অমার্জনীয় অপরাধ। ভুক্তভোগীর মানসিক ক্ষত, সামাজিক লাঞ্ছনা এবং শারীরিক আঘাতের কথা ভাবলে সমাজের ক্রোধ জেগে ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু এই ক্রোধ যখন বিচার ব্যবস্থার মূল স্তম্ভকে আঘাত করতে শুরু করে, তখন সমাজ অজান্তেই অপরাধীর পক্ষ নিয়ে ফেলে। সমাজে কোনো অপরাধ ঘটলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বক্তব্য ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় যে, মামলায় যে আইনজীবী অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়াবেন, তাঁকে সামাজিকভাবে বয়কট ও শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হবে। এই মনোভাব কেবল একটি ব্যক্তিকে ভয় দেখানো নয়, এটি বিচারবিভাগীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত এবং সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘনের প্ররোচনা।

‘Audi Alteram Partem’: সভ্যতার প্রাচীনতম আইনি নীতি

পাশ্চাত্য আইনশাস্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে পুরনো ও মৌলিক নীতিগুলোর একটি হলো লাতিন বাক্যবন্ধ ‘Audi alteram partem’, যার অর্থ— ‘অপর পক্ষের কথা ও শোনো।’ এটি রোমান আইনের ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত এবং আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক বিচারব্যবস্থার মেরুদণ্ড। ইংরেজি বিচারপতি Lord Hewart CJ ১৯২৪ সালে Rex v. Sussex Justices মামলায় ঐতিহাসিক রায়ে বলেছিলেন:

It is not merely of some importance but is of fundamental importance that justice should not only be done, but should manifestly and undoubtedly be seen to be done.

অর্থাৎ, ন্যায়বিচার শুধু ভেতরে ঘটলেই চলবে না, তা বাইরে থেকেও ন্যায়সংগত দেখাতে হবে। একটি বিচার যেখানে এক পক্ষকে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, সেটি আইনের চোখে বিচারই নয়।

বাংলাদেশের সংবিধানে অভিযুক্তের অধিকার সুস্পষ্টভাবে সংরক্ষিত। সংবিধানের ৩৩(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:

গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যত শীঘ্রই সম্ভব গ্রেফতারের কারণ জ্ঞাপন না করিয়া প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না এবং উক্ত ব্যক্তিকে তাঁহার মনোনীত আইনজীবীর সহিত পরামর্শের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না।” এবং ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে:

ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারী হইবেন।” এই সাংবিধানিক বিধানগুলো শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এগুলো রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের মৌলিক প্রতিশ্রুতি। কোনো জনরোষ বা সামাজিক চাপ এই অধিকার বাতিল করতে পারে না।

আইনজীবীর ভূমিকা ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

সমাজের একটি বড় অংশ মনে করেন, যে আইনজীবী ধর্ষকের পক্ষে দাঁড়ান তিনি নৈতিকভাবে দোষী। এই ধারণাটি আইনি পেশার মূল দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক। American Bar Association-এর Model Rules of Professional Conduct-এ স্পষ্ট বলা আছে:

A lawyer’s duty to his client is to represent him zealously within the bounds of the law. An attorney who declines to represent an unpopular client for fear of public opinion fails both his client and the legal system.

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার ১৯৭২-এর আওতায় প্রণীত পেশাগত আচরণবিধি অনুযায়ী একজন আইনজীবীর প্রাথমিক দায়িত্ব হলো আদালতের প্রতি সততা বজায় রাখা এবং মক্কেলের আইনি স্বার্থ রক্ষা করা; তবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত না করে। বিখ্যাত আইনি দার্শনিক Alan Dershowitz তাঁর The Best Defense (১৯৮২) গ্রন্থে লিখেছেন:

Defense attorneys who represent the worst among us serve the best values of our legal system. Without zealous advocacy for unpopular defendants, there is no legal system worthy of respect.

অর্থাৎ, যে বিচারব্যবস্থা সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধীকেও সঠিক আইনি প্রতিনিধিত্ব দেয়, সেই বিচারব্যবস্থাই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য।

প্রতিনিধিত্বহীনতার বিপদ ও আইনি বিশ্লেষণ

অভিযুক্ত যদি আইনজীবী না পায়, তাহলে কী ঘটে? ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর বিধান অনুযায়ী, বিচারের প্রতিটি পর্যায়ে অভিযুক্তকে তাঁর আইনি অধিকার সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। যদি এই প্রক্রিয়া লঙ্ঘিত হয়, তাহলে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হাইকোর্টে ফৌজদারি আপিলে বলতে পারবে যে তাঁর সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। হাইকোর্ট এই যুক্তি গ্রহণ করলে পুনরায় বিচারের নির্দেশ দিতে পারে অথবা সাজা বাতিল করতে পারে। এই পুনর্বিচারের প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর চলে যায়, ভুক্তভোগী আবার আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে বাধ্য হন।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট Strickland v. Washington (১৯৮৪) মামলায় রায় দিয়েছে: “The right to counsel is the right to the effective assistance of counsel. A conviction obtained in violation of this right cannot stand.” এই নীতি বিশ্বের বহু দেশের বিচারব্যবস্থায় প্রভাব ফেলেছে এবং বাংলাদেশের হাইকোর্টও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে এই নীতির সাথে সংগতিপূর্ণ রায় দিয়েছেন।

আরও পড়ুন : যেভাবে এবং যা দিয়ে রামিসা বা অন্য শিশু হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের বিচার দ্রুত হবে

বাংলাদেশ একাধিক আন্তর্জাতিক চুক্তির স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে এই বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে আইনিভাবে বাধ্য। International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর ১৪(৩)(d) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:

Everyone charged with a criminal offence shall have the right to defend himself in person or through legal assistance of his own choosing… and to have legal assistance assigned to him, in any case where the interests of justice so require.

বাংলাদেশ ২০০০ সালে এই চুক্তিতে অনুস্বাক্ষর করেছে। এর পাশাপাশি, জাতিসংঘের Basic Principles on the Role of Lawyers (১৯৯০)-এর ১৬ নম্বর নীতিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে সরকার, সংগঠন বা কোনো ব্যক্তি আইনজীবীকে তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে হুমকি, বাধা বা হয়রানি করতে পারবে না।

ভারতের নির্ভয়া মামলায় (২০১২) দোষী সাব্যস্ত হওয়া আসামিদের মৃত্যুদণ্ড ২০২০ সালে কার্যকর হয়। কিন্তু এই দীর্ঘ আট বছর ধরে প্রতিটি আপিল, প্রতিটি রিভিউ পিটিশন সম্পূর্ণরূপে আইনি প্রক্রিয়া মেনে নিষ্পত্তি হয়েছে। এই কারণেই সেই সাজা চূড়ান্তভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে। প্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি থাকলে সাজা আবার বাতিল হয়ে যেত। অন্যদিকে পাকিস্তানে প্রচণ্ড জনরোষের মুখে দ্রুত বিচারের নামে যেসব মামলা পরিচালিত হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগ উচ্চতর আদালতে প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে খারিজ হয়ে গেছে এবং অপরাধীরা মুক্তি পেয়েছে। বিচারপতি William O. Douglas এই বিষয়ে সুন্দরভাবে বলেছিলেন:

The guilty go free not because the law is soft on crime, but because the law is strict about procedure. Procedure is not a technicality, it is the architecture of justice.

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও আসল সমস্যা কোথায়?

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী ২০২০) অনুযায়ী ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু এই কঠোর আইন থাকার পরেও মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না কেন? সমস্যা আইনজীবীর উপস্থিতিতে নয়, বরং তদন্তের দুর্বলতায়, ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহে বিলম্বে, সাক্ষী সুরক্ষার অভাবে এবং ট্রাইব্যুনালে বিচারক স্বল্পতার কারণে দীর্ঘসূত্রতায়।

জনরোষ বনাম আইনের শাসন

Harvard Law School-এর আইনি দার্শনিক Roberto Unger তাঁর Law in Modern Society (১৯৭৬) গ্রন্থে লিখেছেন: “Mob justice is the antithesis of justice. When we surrender the rule of law to the rule of passion, we lose both, because passion, unlike law, has no memory of its own mistakes.” আইনকে দুর্বল করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সমাজের দুর্বলতম মানুষেরা।

ভুক্তভোগীর জন্যই চাই নিখুঁত বিচার

ধর্ষকের শাস্তি চাই—এই দাবি সঠিক ও ন্যায়সংগত। কিন্তু সেই শাস্তি যেন টেকসই হয়, যেন কোনো ফাঁকফোকর না থাকে, যেন অপরাধী প্রক্রিয়াগত ত্রুটির সুযোগ নিতে না পারে। Roscoe Pound তাঁর Introduction to the Philosophy of Law (১৯২২) গ্রন্থে লিখেছিলেন:

The strength of a democracy is measured not by how it treats its most popular citizens, but by how it treats the least popular — and by extension, whether its legal processes can withstand the test of public passion.

ধর্ষকের আইনজীবী মানেই শত্রু নয়। বরং সেই আইনজীবী একটি নিখুঁত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে, যে বিচারের রায় কেউ উল্টাতে পারে না। আইনের শাসনই একমাত্র পথ যা প্রতিটি অপরাধীর জন্য দ্রুত, নিশ্চিত এবং অপরিবর্তনীয় শাস্তি নিশ্চিত করতে পারে। আমরা চাই, কোনো মা যেন সন্তান হারিয়ে বিচার না পেয়ে আর কাঁদতে না বসেন বিচারের অপেক্ষায়; সেই মেয়েটি যেন জানতে পারে, তার কষ্টের দাম এই দেশ দেবেই। প্রতিটি বাবা যেন সন্তানকে নিয়ে নিরাপদে নিশ্চিন্তে রাত্রিযাপন করতে পারে। এই প্রতিশ্রুতি রাখতে হলে বিচার প্রক্রিয়াকে আরও শক্ত করতে হবে। ন্যায়বিচারের প্রতিটি ধাপ হতে হবে নিশ্চিত ও অবরুদ্ধহীন। কারণ যে আগুন নিয়মের বাইরে জ্বলে, সে আগুন একদিন নিজের ঘরও পোড়ায়।

সর্বোপরি, বিচার হোক মানবতার।

লেখক : রাশিদা চৌধুরী নীলু; আইনজীবী, আপিল বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। ই-মেইল: rasida.chowdhury@gmail.com