একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার। কার্যকর আদালত ব্যবস্থা ও আইনের শাসন না থাকলে মানুষের জীবন, সম্পদ, অধিকার এবং মর্যাদা কোনোটিই নিরাপদ থাকে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পূর্বশর্ত হলো নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ। যদি বিচার ব্যবস্থা নিজেই ধীরগতি, অবকাঠামোগত সংকট এবং সীমিত সক্ষমতার মধ্যে পরিচালিত হয়, তাহলে তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রগতির ওপর পড়ে।
রাস্তা, সেতু কিংবা মেগা অবকাঠামো রাষ্ট্রের উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক হতে পারে; কিন্তু ন্যায়বিচারহীন সমাজে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হয় না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সত্যিকার অর্থে একটি উন্নত, বিনিয়োগবান্ধব এবং স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ: সংখ্যা বনাম বাস্তবতা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সংখ্যাগতভাবে বরাদ্দ কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও বিচার বিভাগের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন, মামলা জট, অবকাঠামোগত সংকট এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের চাহিদার আলোকে এই বরাদ্দ কতটা যথেষ্ট, তা গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মোট জাতীয় বাজেটের বিপরীতে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ মাত্র প্রায় ০.২৩ শতাংশ। অথচ বিচার বিভাগই নাগরিকের অধিকার, সম্পদ, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়স্থল। বিচার বিভাগ শুধু একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সমতা এবং আইনের শাসনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করা মানেই রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা। কিন্তু জাতীয় বাজেটে এই খাতের জন্য এত সীমিত বরাদ্দ থেকে প্রতীয়মান হয় যে রাষ্ট্র পরিচালনার অগ্রাধিকার তালিকায় বিচার বিভাগ এখনো কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব লাভ করেনি।
উন্নয়ন বরাদ্দের নেতিবাচক চিত্র
বরাদ্দের তুলনামূলক চিত্র আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য মোট ২,১৫৯.৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে পরিচালন খাতে ১,৮৯৩.৮৯ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন খাতে ২৬৫.৮৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট বরাদ্দ বেড়ে ২,১৮৮ কোটি টাকায় উন্নীত হলেও পরিচালন খাতে ১,৯৯৮.৮৬ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন খাতে মাত্র ১৮৮.৭২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থাৎ, মোট বরাদ্দ প্রায় ২৮ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেলেও উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা। অথচ বিচার বিভাগের কাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং সেবার মানোন্নয়নের মূল ভিত্তিই হলো উন্নয়ন ব্যয়।
উন্নয়ন বরাদ্দ হ্রাসের বহুমাত্রিক প্রভাব
এই উন্নয়ন বরাদ্দ হ্রাসের প্রভাব বহুমাত্রিক হতে পারে:
-
অবকাঠামোগত সংকট: দেশের আদালতগুলোতে বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মামলা জট কমাতে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলেও অনেক স্থানে পর্যাপ্ত এজলাস, আদালত ভবন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। নতুন আদালত ভবন নির্মাণ, বিদ্যমান ভবনের সম্প্রসারণ ও সংস্কার এবং বিচারিক কার্যক্রমের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উন্নয়ন বাজেট হ্রাস সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
-
ডিজিটাল রূপান্তরে বাধা: আধুনিক বিচারব্যবস্থা ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। ই-কোর্ট, ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট, ই-ফাইলিং, ভার্চুয়াল শুনানি এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিচারিক ব্যবস্থার সম্প্রসারণের জন্য ধারাবাহিক বিনিয়োগ অপরিহার্য। উন্নয়ন খাত সংকুচিত হলে বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরের গতি স্বাভাবিকভাবেই মার্থা বা মন্থর হবে।
-
বিচারকদের আবাসন ও নিরাপত্তা: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারকদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় কর্মপরিবেশ এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে এসব খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
-
চৌকি আদালতের জরাজীর্ণ দশা: দেশের বহু আঞ্চলিক ও চৌকি আদালত এখনো পুরোনো ও অনুপযোগী ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী এবং আদালত-সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য আধুনিক, নিরাপদ ও কার্যকর অবকাঠামো নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। কিন্তু উন্নয়ন বরাদ্দ কমে গেলে এসব প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপসংহার: ন্যায়বিচার কোনো ব্যয় নয়, এটি বিনিয়োগ
প্রকৃতপক্ষে ন্যায়বিচার কোনো সাধারণ রাষ্ট্রীয় ব্যয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগের নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা।
সুতরাং, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিচার বিভাগের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বরাদ্দ গ্রহণযোগ্য হলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন, মামলা জট নিরসন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য তা পর্যাপ্ত বলে মনে হয় না।
একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের স্বার্থে বিচার বিভাগের উন্নয়নকে ব্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ শক্তিশালী বিচার বিভাগ ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, আর আইনের শাসন ছাড়া কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। তাই বিচার বিভাগের বাস্তব প্রয়োজন, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে এই খাতে আরও বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনভিত্তিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
লেখক : মোঃ রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী; আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

