কোর্ট রিপোর্টার, চট্টগ্রাম | চট্টগ্রামে ৫ বছরের শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে অপহরণের পর অত্যন্ত নৃশংসভাবে শ্বাসরোধে হত্যা এবং লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে কেটে ছয় টুকরো করার আলোচিত মামলায় প্রধান আসামি মো. আবীর আলীকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সাথে তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার (১৭ জুন) চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাসের আদালত আসামির উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পর কড়া পুলিশি পাহারায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আবীরকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত: প্রসিকিউশন
রায় ঘোষণার পর চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মোহাম্মদ রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী বলেন:
আসামি আবীর আলী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, সুরতহাল রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, আলামত উদ্ধার এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যালোচনায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আসামির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের রায় আদেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে ১ লাখ অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ১ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) জালাল উদ্দিন জানান, অত্যন্ত সংবেদনশীল এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মোট ৩৩ জন সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয় পক্ষের আইনি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত আজ এই রায় প্রদান করলেন।
ক্রাইম পেট্রোল দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে নৃশংসতা: আদালতের পর্যবেক্ষণ
আদালতের বিচারক মুহাম্মদ আলী আক্কাস রায়ের পর্যবেক্ষণে অপরাধের ভয়াবহতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরেন। এপিপি মোহাম্মদ রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী জানান, আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘এই ঘটনাটি পূর্ব পরিকল্পিত, নিষ্ঠুর নৃশংস, নির্মম ও সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ক্রাইম পেট্রোল থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েছে।’
অপহরণ, মুক্তিপণ ও লাশ টুকরো করার লোমহর্ষক ইতিহাস
পুলিশ ও আদালত সূত্রের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানার বন্দরটিলা এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার ৫ বছরের শিশু কন্যা আলিনা ইসলাম আয়াত আচমকা নিখোঁজ হয়। এই ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে ইপিজেড থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলে পরবর্তীতে ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
পিবিআইয়ের নিবিড় তদন্তে বেরিয়ে আসে, আয়াতদের নিজেদের বাসার ভাড়াটে মো. আবীর আলীই ছিল এই নিখোঁজের নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ড। ২০২২ সালের ২৫ নভেম্বর আবীরকে গ্রেফতার করে পিবিআই। গ্রেফতারের পর আবীর আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে আয়াতকে নৃশংসভাবে হত্যার কথা সবিস্তারে স্বীকার করে।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসে, মূলত মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের অসৎ উদ্দেশ্যেই শিশু আয়াতকে অপহরণ করেছিল আবীর। তবে পরবর্তীতে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার ভয়ে সে আয়াতকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর অপরাধের আলামত ও লাশ সম্পূর্ণ গুম করার উদ্দেশ্যে শিশুটির মরদেহ ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে নির্মমভাবে ছয়টি খণ্ড করে। খণ্ডিত মরদেহের অংশগুলো আবীর চট্টগ্রামের আকমল আলী রোডের স্লুইসগেট সংলগ্ন সাগরপাড় এবং পতেঙ্গার আউটার রিং রোড সংলগ্ন খালের পাশে ফেলে দেয়।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর পিবিআইয়ের তৎকালীন পরিদর্শক মনোজ দে আদালতে এই মামলার চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। অভিযোগপত্রে মো. আবীর এবং তার ১৭ বছর বয়সী এক বন্ধুকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুক্ত বন্ধুটি আইনানুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক বা কিশোর হওয়ায় তার অংশটি আলাদাভাবে শিশু আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
আইনজীবীরা বলছেন, টেলিভিশনে অপরাধমূলক অনুষ্ঠান বা ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে যেভাবে ৫ বছরের একটি শিশুকে কেটে টুকরো করা হয়েছে, এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে একটি কঠোর বার্তা যাবে এবং এর ফলে ভিকটিম আয়াতের পরিবার দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার পেল।

