কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট বা আইনজীবী তালিকাভুক্তকরণ লিখিত পরীক্ষার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় সম্পূর্ণ সাদা খাতা জমা দেওয়া এবং পরীক্ষায় একেবারেই অনুপস্থিত থাকা দুই পরীক্ষার্থীর ফলাফল পুনঃমূল্যায়নের (Review) আবেদনের প্রেক্ষিতে এই জালিয়াতি ধরা পড়ে। এই জঘন্য ও ধৃষ্টতাপূর্ণ কর্মকাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট দুই পরীক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কারসহ কঠোর আইনি শাস্তির মুখোমুখি করতে কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) জারি করেছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল।
গতকাল ২৩ জুন, ২০২৬ইং তারিখে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট কমিটির নির্দেশক্রমে উপ-পরিচালক (এনরোলমেন্ট) মাহফুজুল মুর্শেদ স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি জরুরি অফিশিয়াল চিঠিতে (স্মারক নং-বিবিসি/এনরোল/২০২৬/১৮০৩ এবং ১৮০৪) এই কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছে। নোটিশে আগামী ১০ (দশ) কর্মদিবসের মধ্যে সরাসরি ‘সচিব, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল’ বরাবরে লিখিত জবাব দাখিল করার জন্য অভিযুক্তদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনা ১: সম্পূর্ণ সাদা খাতা জমা দিয়ে ‘অদৃশ্য’ উত্তরপত্র রিভিউর আবেদন!
প্রথম নোটিশটি (স্মারক নং ১৮০৪) পাঠানো হয়েছে লক্ষ্মীপুর জেলার লক্ষ্মীপুর সদর থানার শমসেরাবাদ (৯ নং ওয়ার্ড) এলাকার বাসিন্দা মুহাম্মদ রুহুল আমিনের পুত্র মুহাম্মদ সাইফুল আমিন-কে (রোল নং ২৬৯৩৭, রেজিস্ট্রেশন নং ২০২২৫৬৮৯৪)।
নোটিশে বলা হয়, সাইফুল আমিন গত ২৮ জুন, ২০২৫ইং তারিখে অনুষ্ঠিত বার কাউন্সিল এনরোলমেন্ট লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। ওই পরীক্ষার ফলাফল গত ২৫ অক্টোবর, ২০২৫ইং তারিখে প্রকাশিত হলে তিনি অনুত্তীর্ণ হন। এরপর অনুত্তীর্ণ প্রার্থীদের যৌক্তিক কারণ থাকা সাপেক্ষে অনলাইনে খাতা পুনঃমূল্যায়ন বা রিভিউ আবেদনের সুযোগ দেওয়া হলে তিনিও আবেদন করেন।
কিন্তু বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট কমিটি রেকর্ড এবং মূল উত্তরপত্র যাচাই করতে গিয়ে হতভম্ব হয়ে পড়ে। নথিপত্রে দেখা যায়, সাইফুল আমিন পরীক্ষার দিন সম্পূর্ণ সাদা খাতা (Blank Answers Script) জমা দিয়ে এসেছিলেন। নোটিশে বার কাউন্সিল অত্যন্ত কঠোর ও ক্ষুব্ধ ভাষায় প্রশ্ন তুলেছে:
যে লিখিত পরীক্ষায় আপনি উত্তরপত্রে একটি অক্ষরও লিখেন নাই তথা সম্পূর্ণ সাদা খাতা জমা প্রদান করেছেন সেই পরীক্ষার ব্ল্যাঙ্ক/সাদা উত্তরপত্র কীসের ভিত্তিতে পুনঃমূল্যায়ণ/রিভিউ করতে চেয়েছিলেন এবং কোন মানদণ্ডে বা কোন্ প্রক্রিয়ায় আপনার সেই ‘অদৃশ্য/কাল্পনিক’ প্রশ্নোত্তর রিভিউ করা যেতো?
ঘটনা ২: পরীক্ষায় অনুপস্থিত থেকেও খাতা পুনঃমূল্যায়নের দাবি!
দ্বিতীয় নোটিশটি (স্মারক নং ১৮০৩) পাঠানো হয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলার সিরাজগঞ্জ সদর থানার হোসেনপুর নর্থ (বাগানবাড়ী) এলাকার বাসিন্দা মোঃ সাইদুল ইসলামের পুত্র এম.আর. আকাশ-কে (রোল নং ৮৪২০৫, রেজিস্ট্রেশন নং ২০২১০৮৩৪৮)।
আকাশের ক্ষেত্রে জালিয়াতির মাত্রা আরও এক ধাপ ওপরে। নোটিশে বলা হয়, তিনি গত ২৮ জুন, ২০২৫ইং তারিখের উক্ত লিখিত পরীক্ষায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত (Absent) ছিলেন। ২৫ অক্টোবর ফলাফল প্রকাশের পর তিনিও অবলীলায় অনলাইনে খাতা পুনঃমূল্যায়নের রিভিউ আবেদন ঠুকে দেন! পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রাসঙ্গিক তথ্য ও হাজিরা খাতা যাচাই করে তার এই চরম ধৃষ্টতা এনরোলমেন্ট কমিটির গোচরীভূত হয়। নোটিশে তাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়:
যে লিখিত পরীক্ষায় আপনি অংশগ্রহণই করেন নাই সে পরীক্ষার উত্তরপত্র/ফলাফল কীসের ভিত্তিতে পুনঃমূল্যায়ণ/রিভিউ করতে চেয়েছিলেন এবং কোন্ মানদন্ডে বা কোন্ প্রক্রিয়ায় আপনার সেই ‘অদৃশ্য’/‘কল্পিত’ উত্তরপত্র রিভিউ করা যেতো?
নোটিশে দুই প্রার্থীকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই কাল্পনিক ও জালিয়াতিপূর্ণ রিভিউর চেষ্টার পেছনে তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল তার ব্যাখ্যাসহ বার কাউন্সিল তাদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না সে বিষয়ে আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছে।

