বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা | বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির অভিভাবক, সাবেক স্পিকার, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার আর নেই। আজ রোববার ভোর ৪টা ১৮ মিনিটে শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (SCBA) সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, “স্যার আজ ভোরে আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন যাবত তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর এই বিদায় দেশের আইন অঙ্গন এবং জাতীয় রাজনীতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।”
প্রবীণ এই রাজনীতিকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সুপ্রিম কোর্ট ও রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। দীর্ঘদিনের সহকর্মী, বিচারপতি এবং আইনজীবীদের অনেকে শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে ধানমন্ডির বাসভবনে ছুটে যান।
ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং নজরুল ইসলাম খানসহ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা এই প্রবীণ নেতার প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অধ্যায়
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের অবদান অবিস্মরণীয়:
-
জাতীয় সংসদ ভবন সম্পন্নকরণ: সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে তিনি যখন গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, তখনই শেরেবাংলা নগরের বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবনের অসমাপ্ত নির্মাণকাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
-
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা: ১৯৯৬ সালে বিএনপির স্বল্পকালীন সরকারে তিনি যখন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, ঠিক তখনই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ সংবিধানে যুক্ত করার ঐতিহাসিক আইনি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছিল।
-
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি: ২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে রাষ্ট্রপ্রধানের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
-
অষ্টম সংসদের স্পিকার: ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১/১১-এর জরুরি অবস্থা পেরিয়ে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে নবম সংসদের নতুন সদস্যদের স্পিকার হিসেবে তিনিই শপথ পড়ান এবং ২৫ জানুয়ারি ২০০৯ সালে তাঁর স্পিকারের গৌরবোজ্জ্বল মেয়াদ শেষ হয়।
শিক্ষা, আইনি ক্যারিয়ার ও মুক্তিযুদ্ধ
১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জমিরউদ্দিন সরকার। তাঁর বাবা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স এবং মা বেগম ফখরুন্নেছা।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি (LLB) ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে লন্ডনের বিখ্যাত ‘লিংকনস ইন’ থেকে ব্যারিস্টার-এট-ল সনদ লাভ করেন। দেশে ফিরে ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যুক্ত হয়ে সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন কিংবদন্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
ছাত্রজীবনে ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসা এই নেতা পরবর্তীতে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের যে আইনজীবীদের গ্রুপটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, জমিরউদ্দিন সরকার ছিলেন তাদের অন্যতম অগ্রপথিক। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান জাগদল গঠন করলে তিনি তাতে যোগ দেন এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আমৃত্যু দলটির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম ‘স্থায়ী কমিটির’ সদস্য ছিলেন।
৭ বারের সংসদ সদস্য ও কালজয়ী গ্রন্থসমূহ
ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার তাঁর রাজনৈতিক জীবনে মোট ৭ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৯ সালে দিনাজপুর-১ আসন থেকে প্রথমবার, ১৯৯১ সালে ঢাকা-৯ আসন থেকে, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে এবং ২০০৯ সালে বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিভিন্ন সময়ে তিনি পররাষ্ট্র, ভূমি, শিক্ষা, এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন।
আইন ও সংসদীয় ব্যবস্থার ওপর তাঁর লেখা বেশ কিছু আকর গ্রন্থ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
-
গণতন্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
-
এক নজরে সংসদ সম্পর্কিত বিধিবিধান
-
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ও ডিগবাজি
-
পল রাজ থেকে পলাশী এবং ব্রিটিশ রাজ থেকে বঙ্গভবন
-
দি ল অব দি সি (The Law of the Sea)
-
ল অব দি ইন্টারন্যাশনাল রিভারস অ্যান্ড আদার ওয়াটারকোর্স
পারিবারিক জীবনে তাঁর স্ত্রী নূর আখতার ২০২৩ সালে মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি কন্যা নিলুফার জমির এবং দুই পুত্র নওশাদ জমির ও নওফেল জমিরকে রেখে গেছেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যারিস্টার নওশাদ জমির বর্তমানে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
